যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন জোটের সেনা প্রত্যাহারের সুযোগে দুই দশক পর ফের আফগানিস্তানের

আফিম চাষ ও তালেবানের পিছু হটা, ঝুঁকিতে বিশ্ব

যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন জোটের সেনা প্রত্যাহারের সুযোগে দুই দশক পর ফের আফগানিস্তানের

যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন জোটের সেনা প্রত্যাহারের সুযোগে দুই দশক পর ফের আফগানিস্তানের ক্ষমতার দৃশ্যপটে তালেবান। একসময় পাকিস্তানের মদদে পুষ্ট হয়ে ওঠা কট্টর এই গোষ্ঠীটি ‘অনেক বদলের’ প্রতিশ্রুতি দিয়ে অভাবনীয় দ্রুততার সাথে ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছেছে। সাথে করে নিয়ে আসে নারীর প্রতি সম্মান দেখানো, তাদের শিক্ষার ব্যবস্থা করা, বিগত সরকারের সেনা ও পুলিশ সদস্যদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা, মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার মতো আরো অনেক প্রতিশ্রুতির ফুলঝুড়ি। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই পাশার ছক ঘুরিয়ে উল্টো পথে তালেবান। সময় গড়ানোর সাথে সাথে খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসছে তাদের পুরনো চেহারা। আন্তর্জাতিক বিশ্বের সাথে তালেবানের সম্পর্কের নতুন মেরুকরণের বিষয়টি ঘুরে-ফিরে আলোচনায় এলেও প্রতিশ্রুতি থেকে তাদের ‘পিছু হটা’ ভাবনার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। পুরনো কিছু নিষ্ঠুর ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার সাথে যোগ হয়েছে দেশটির দুর্বল অর্থনৈতিক অবস্থা।

আফগানিস্তানের এই ভেঙ্গে পড়া অর্থনীতিই এখন দুশ্চিন্তার কারণ। তাও হয়ত ধীরে ধীরে সামাল দেওয়া যেত।কিন্তু ক্ষুধা, দারিদ্র্যের সাথে ঝুকতে থাকা দেশটি এখন মাথা ব্যথার কারণ হয়ে উঠেছে যে কারণে সেটি হচ্ছে বিশ্বজুড়ে এর মাদকের কারবার। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা দেশটি থেকে হাত গুটিয়ে নেওয়ায় অর্থনীতিকে দাঁড় করাতে প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসে সেই ব্যবসাকেই, অর্থাৎ আফিম চাষকে বৈধতা দিতে চাইছে তালেবান। যেখানে পুরো বিশ্বই মাদকের বিরুদ্ধে লড়ছে, সেখানে তালেবানের এই উল্টো পথে হাঁটার চেষ্টা প্রমাদ গোনার কারণ হয় বৈকি। এই মাদক ব্যবসা থেকে তালেবানের লাভবান হওয়ার ইতিহাস নতুন নয়। কুড়ি বছর আগেও যখন তারা ক্ষমতায় ছিল তখনও তারা বিভিন্ন খাতের মতো মাদক ব্যবসা থেকেও কর আদায় করেছে। আর অনেকটা সেই অর্থের ওপর ভর করেই এতদিন ধরে যুদ্ধের রসদ জোগাড় করেছে তারা। যুদ্ধের মাঠ ছেড়ে এখন ক্ষমতার মসনদে বসে যেহেতু মিলেছে ভঙ্গুর একটি অর্থনীতি, ফলে এখন আবার ‘লাভজনক‘ মাদক ব্যবসার পুরনো পথেই হাঁটছে তারা। অথচ, কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার পর আফিম চাষ বন্ধের প্রতিশ্রুতি জানান দিয়েছিল তালেবান।

তালেবান সরকারের উপ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হাজি আবদুল হক আখন্দ হামকার বলেছেন, আফিম চাষকে কৃষিকাজ হিসেবে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। আর সেটা হলে আফগান জনগণ নাকি উপকৃত হবে। তার কথায় একটি বিষয় পরিষ্কার, বিশ্বজুড়ে মাদকের যে ছোবল, তা নিয়ে তালেবানের এখন আর খুব একটা মাথাব্যথা নেই, তাদের যত চিন্তা নিজেদের রোজগার নিয়ে। দেশটির মাদক ব্যবসার নেটওয়ার্ক এতটাই বিস্তৃত আর শক্তিশালী যে, এর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিশ্বের লড়াইটা জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের চেয়েও কঠিন আর দীর্ঘমেয়াদী হতে পারে। কতটা বিস্তৃত আফগান মাদক কারবার? দেশটিতে মূলত চাষ হয় পপি গাছের। এই পপি ফলের নির্যাস আফিম থেকে তৈরি হয় হেরোইনের মত ভয়ংকর মাদক। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক কার্যালয়ের (ইউএনডিওসি) মতে, বিশ্বে সর্বাধিক ৮০ শতাংশ আফিম উৎপাদিত হয় আফগানিস্তানে।

২০১৮ সালে ইউএনডিওসির দেয়া তথ্য অনুযায়ী, আফগান অর্থনীতিতে মাদক কারবারের অংশ ১১ শতাংশ। বিবিসির তথ্য, ইউরোপে যাওয়া ৯৫ শতাংশ হেরোইনই আফগানিস্তানের আফিম থেকে উৎপন্ন। তবে আফগানিস্তানের হেরোইন মাত্র এক শতাংশ যায় যুক্তরাষ্ট্রে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট এজেন্সির তথ্য। কঠোর ধর্মীয় অনুশাসনের কথা বললেও তালেবান কিন্তু ঠিকই মাদক কারবারের বখরা নিয়েছে নিয়মিত। অর্থের
জন্য তারা পপি চাষের আওতায়ও বাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের তথ্য অনুযায়ী, তালেবান শাসনের সময়েই ১৯৯৪ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে দেশটিতে পপি চাষের জমি ৪১ হাজার হেক্টর থেকে বেড়ে ৬৪ হাজার হেক্টরে দাঁড়ায়।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, অবৈধ আফিমের ৩৯ শতাংশই উৎপাদিত হতো তালেবান নিয়ন্ত্রিত হেলমান্দ প্রদেশে। ২০০০ সালে তালেবান তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় পপি চাষ নিষিদ্ধ করলে পরের দুই বছরে মাদক আটকের ঘটনাও কমে আসে। কিন্তু তারপর থেকে আবার বদলে যেতে থাকে চিত্র। সদ্য ক্ষমতাচ্যুত সরকারের সময়ে পপি চাষ নিয়ন্ত্রণ করা হলেও তালেবান নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে ঠিকই চলতে থাকে। ২০২০ সালেই তালেবানের নিয়ন্ত্রণে থাকা
হেলমান্দ প্রদেশের বেশিরভাগ কৃষিজমিতেই পপি চাষ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের তথ্য বলছে, তালেবান মূলত কয়েকভাবে মাদক ব্যবসা থেকে কর আদায় করে।
প্রথমত, পপি চাষ থেকে। অভিযোগ রয়েছে, তালেবান পপিচাষিদের কাছ থেকে ১০ শতাংশ হারে কর আদায় করে। এছাড়া আফিম থেকে হেরোইন উৎপাদনের ল্যাবরেটরি এবং মাদক পাচারের ব্যবসা থেকেও আদায় করা হয় কর। অবৈধ মাদক কারবারে তালেবানের অংশিদারিত্বের পরিমাণ ৪০০ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে বলে ধারণা করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের স্পেশাল ইন্সপেক্টর জেনারেল ফর আফগান রিকন্সট্রাকশনের (সিগার) কমান্ডার জেনারেল জন
নিকোলসন জানিয়েছেন, তালেবানের বার্ষিক আয়ের ৬০ শতাংশ আসে এই মাদক কারবার থেকে। এমন লাভজানক আর লোভনীয় কারবার থেকে তালেবান যে মুখ ঘুরিয়ে থাকবে না, তা বলাই বাহুল্য, যখন দেশের অর্থনীতিও নাজুক অবস্থায়।

তালেবান যে পরিমাণ অর্থ এই কারবার থেকে আয় করেছে, তাতে করে তারা এই পথ থেকে ফিরতে পারবে না। তাছাড়া গরিব চাষিরাও আফিম ছাড়া টিকতে পারবে না। উৎপাদিত বিশাল মাদকের ভাণ্ডার নিয়ে নিশ্চয়ই তালেবান হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না। যেহেতু পপি চাষকে তারা বৈধতা দিতে চাইছে, তাই নিজেরা লাভবান হওয়ার জন্যই হোক আর দেশের অর্থনীতির কথা ভেবেই হোক, মাদকের বৈশ্বিক অবৈধ বাজারের দিকে তাদের হাত বাড়াতেই হবে। বিপদ সেখানেই। তালেবানের পৃষ্ঠপোষকতায় বিশ্বজুড়ে মাদকের বিস্তার তখন নিঃসন্দেহে হয়ে উঠবে ঝুঁকির কারণ।

দৈনিক বিজয় নিউজ/ডব্লিউবি