টেনিদার দিনাজপুর, দিনাজপুরের টেনিদা!

টেনিদার দিনাজপুর, দিনাজপুরের টেনিদা!
ছবিঃ মোঃ আতিউর রহমান

দৈনিক বিজয় নিউজ দিনাজপুর প্রতিনিধিঃ

পটলডাঙার বাসিন্দা ভজহরি মুখার্জি ওরফে টেনি।খাঁড়ার মতো নাক তার! সাতবারের চেষ্টায় অতিকষ্টে পাস করেছেন মাধ্যমিক, ছেলেপেলে তাই ডাকে 'টেনিদা' বলে। ঢব মারতে আর নানান রকম আজগুবি এক্সপেরিমেন্ট করে শেষবেলায় কিছু একটা ঝামেলা পাকাতে তার জুড়ি মেলা ভার৷ পাড়ার রকে আড্ডা দেওয়া, এর-ওর পেছনে লাগা, বিনে দাওয়াতে নেমন্তন্ন খাওয়ার জন্য আছে তার বিরাট দলবল। সঙ্গীদের নামগুলোও হয়েছে তেমন - প্যালা, হাবুল, ক্যাবলা! "ডি-লা গ্রান্ডি মেফিস্টোফিলিস ইয়াক ইয়াক"! সব অপারেশন শেষে এই হচ্ছে টেনিদার সিগনেচার সেলিব্রেশন ! এই শব্দের মানে কি, আজও কোনও ডিকশনারি বের করতে পারল না!

ছেলেবেলায় টেনিদার কার্টুন-কমিক দেখেনি, পড়েনি - এমন ৯০'স কিড কমই। অথচ অনেকেই জানেন না, টেনিদার সঙ্গে জুড়ে আছে যে দিনাজপুরের নাম! 'টেনিদার' জনক, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্ম দিনাজপুরের ঠাকুরগাঁও মহকুমার (অধুনা বিলুপ্ত) বালিয়াডাঙ্গিতে, ১৯১৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি। পিতা প্রমথনাথ গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন পুলিশের কর্মকর্তা। সেই সূত্রেই দিনাজপুরে বেড়ে ওঠা। অল্প বয়সে মাকে হারান৷ শিক্ষাজীবনের শুরুটাও এখানেই। তখন স্কুল বলতে একটি৷ দিনাজপুর জিলা স্কুলের কৃতি ছাত্র হিসেবে ১৯৩৩ সালে ম্যাট্রিকুলেশন বা প্রবেশিকা পাশ করেন।

এরপর রাজেন্দ্র কলেজ,ব্রজমোহন কলেজে পড়েছিলেন। বিপ্লবী কর্মকান্ডে জড়িয়ে জেলও খেটেছেন। সর্বশেষ ১৯৪১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন৷ শ্রেষ্ঠ ফলাফল করে পেয়েছিলেন 'ব্রহ্মময়ী স্বর্ণপদক'। কর্মজীবনে শিক্ষকতা করেছেন, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার শিক্ষক ছিলেন। শিক্ষক হিসেবে তার এতোই জনপ্রিয়তা ছিলো যে, ভার্সিটিতে ভোটের সময় নাকি ছাত্রনেতারা প্রতিশ্রুতি দিতো, 'নারায়ণ বাবুর ক্লাস এনে দেব!'

হবে না-ই বা কেন! শোনা যায়, ভদ্রলোকের ছিল অদ্ভুত মেধাশক্তি। একবার না দেখেই তারাশঙ্করের গল্প হুবহু পড়ে শুনিয়েছিলেন ছাত্রদের। এই ছাত্রদের একজন কিন্তু আমাদের অপু, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ! সাপ্তাহিক দেশ পত্রিকায় নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের 'সুনন্দর জার্নাল' বেশ চলতো৷ তাঁর রচিত উপন্যাস-' উপনিবেশ(৩খন্ড-১৯৪১-৪৬), বৈজ্ঞানিক('৪৭), শিলালিপি('৪৯) প্রভৃতি। লিখেছেন রামমোহন, ভাড়াটে চাই সহ বেশকিছু নাটক। তবে মূল কৃতিত্ব গল্পকার হিসেবে। 'বীতংস'('৪৫), দুঃশাসন('৪৫), ভোগবতী('৪৭),চারমূর্তি, টেনিদার অভিযান প্রভৃতি তাঁর সমাদৃত গল্পগ্রন্থ।

শুধু শিক্ষক-সাহিত্যিকই নন, অনেক ছবির চিত্রনাট্যও লিখেছেন তিনি। উত্তম-সুচিত্রা জুটির 'কমললতা('৬৯) তার একটি। তবে সব ছাপিয়ে, তিনি শিশুদের লেখক, 'টেনিদার জনক' হিসেবেই অমর। আনন্দ পুরষ্কার, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডি-লিটসহ বেশকিছু সম্মাননা পেয়েছিলেন৷ বাংলাদেশের ৭ম শ্রেণির বাংলা পাঠ্যবইয়ে তাঁর একটি গল্প সংযুক্ত আছে। এছাড়াও, ভারতের মাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে তাঁর রচনা পড়ানো হয়। মাত্র ৫২ বছর বয়সে পরলোকগত হন দিনাজপুরের এই কৃতিসন্তান। দিনাজপুরের মানুষ কি মনে রেখেছে তাদের ভূমিপুত্রকে?

দৈনিক বিজয় নিউজ/ মোঃ আতিউর রহমান