৫-আগস্ট ২০২৪ বিপ্লব বনাম উন্নয়ন উদ্গীরণ

৫-আগস্ট ২০২৪ বিপ্লব বনাম উন্নয়ন উদ্গীরণ
ছবি: এম এ খালেক খান

দৈনিক বিজয় নিউজ প্রতিনিধিঃ

চারটি মহৎ মূলনীতির আদর্শ নিয়ে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। এই স্বাধীনতার প্রকট চাওয়া-পাওয়া ছিল বৈষম্য বিলোপ, ন্যায়ভিত্তিক শাসন। ৫৩ বছর স্বাধীন বাংলাদেশ চলছে। চার মূলনীতি বাস্তবায়ন কতটুকু হলো, কি হলো না, কেন হলো না, বাংলাদেশের সংবিধান ম্যান্ডেডযুক্ত এই চার মূলনীতির বাস্তবায়ন বিষয়ক কোষ, গবেষণা, রেটিং, রেগুলেশন কি হয়েছে, আমরা সাধারণ নাগরিক তা জানি না, বুঝি না। তদানীন্তন পাকিস্থানের প্রেসিডেন্ট আইয়ূব খান অবকাঠামো উন্নয়নের প্রভূত অর্জন করে ঢাক-ঢোল বাজিয়ে উন্নয়ন দশক পালন করেছিলেন। আমি তখন স্কুল পড়–য়া হলেও সমাজ সচেতন মানসিকতায় রাজনৈতিক সভা-সমিতিতে যেতাম। মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, বেগম মতিয়া চৌধুরীর সঙ্গে আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠ থেকে বানদীঘি স্কুল মাঠের সভায় মিছিলের সঙ্গে হেঁটেই গেছি। ব্যক্তি স্বার্থবিহীন, কড়া-তুখোড় রাজনৈতিক বক্তব্য আবর্ত দেখেছি। বেগম মতিয়া চৌধুরীকে অগ্নিকন্যা উপাধি দেওয়ার যথার্থতা বুঝেছি। এই জীবনে ইতিহাসে পড়া ছাড়াও স্বচক্ষে যে সমস্ত বিপ্লব দেখেছি কোনো বিপ্লবই ৫-ই আগস্টের মতো লঙ্কাকা- হয় নাই। মাওলানা ভাসানী বিশাল জনগোষ্ঠীর সভা মঞ্চ থেকেই বারংবার ঘোষণা দিয়েছেন “অন্যকে কম দিয়ে কম খাইয়্যে যারা সম্পদের পাহাড় গড়ছেন, এই সমস্ত বুর্জোয়াদের মালামাল লুট করার আবশ্যকতা আছে, মাল-এ গণিমাত হালাল হ্যায়, মাল-এ গণিমাত হালাল হ্যায়”। সভায় অংশগ্রহণকারীগণ দলে দলে বাড়ি ফেরার সময় কোনো বিত্তবান সম্পদশালীর মালামাল লুট করেছে, দেখি নাই।


প্রিয় পাঠক, মূল্যবোধ, নৈতিক বলে বলিয়ান মানুষ স্বপ্রণোদিতভাবেই সংযত থাকে, নিয়ন্ত্রিত থাকে। অন্যের এখতিয়ারের মালামাল গ্রহণ করাকে লজ্জাবোধ করে, লজ্জা ঈমানের অঙ্গ। তৎকালীন বঞ্চিত পূর্ব-পাকিস্থানে প্রেসিডেন্ট আইয়ূব খান সাহেব অনেক অবকাঠামোগত উন্নয়ন করেছিলেন। আইয়ূব খান সাহেবের সময় মানবিকতা, নৈতিকতার উন্নয়ন অপেক্ষা অবকাঠামোগত উন্নয়ন অনেক বেশি করেছিলেন। তাই উন্নয়ন দশক পালন করে Complacent এবং অহংবোধের আড়ালে Basic Democracy প্রবর্তন করেছিলেন। পাকিস্থানের জাতির পিতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ সাহেবের সহোদর বোন ফাতেমা জিন্নাহ্কে আইয়ূব খানের গোলাপ ফুল মার্কা নির্বাচনী প্রতীকের প্রতিদ্বন্দী হিসেবে হারিকেন মার্কায় ফাতেমা জিন্নাহ্র প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীর নির্বাচনী অনেক সভায় অংশগ্রহণ করেছি। বিশেষ করে সে সময়ের যুক্তফ্রন্ট নেতা শেখ মুজিবুর রহমান সাহেব যে সমস্ত সভায় উপস্থিত থাকতেন সেই সভাগুলো যতো দূরেই হোক না কেন উপস্থিত হয়েছি। আমরা নিশ্চিত ছিলাম ফাতেমা জিন্নাহ্ প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন। উন্নয়নের অহংকারে আইয়ূব খান সাহেব নির্বাচনী পদ্ধতি গণভোটের পরিবর্তে মৌলিক ভোট (Basic Democracy) প্রবর্তন করলেন। গোকুল স্কুলের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের ইসাহাক বক্তার সাহেবের সঙ্গে বিভিন্ন চেয়ারম্যান, মেম্বার যারা Basic Democracy’র ভোটার তাদেরকে কোরআন স্পর্শ করে হারিকেন মার্কায় ভোট দেওয়ার প্রতিশ্রুতি করা দেখেছি। তৎপর শাসক দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর ক্ষমতা ও সম্পদের টানে গোলাপ ফুল মার্কা বেশি ভোট পেয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিল (কোরআন স্পর্শকারী অনেক চেয়ারম্যান, মেম্বারকে বললে তারা বলতেন মলাট ছুঁয়েছি, কোরআন ছুঁই নাই)। তখন নিখিল পাকিস্থানের বিশেষ করে পূর্ব-পাকিস্থানের সচেতন ভোটাররা ডাবল Basic Democracy বনাম Control Democracy দ্বারা গণআকাঙ্খা পূরণ হবে না। মাওলানা ভাসানী সাহেব বললেন, “ভোটের বাক্সে লাথি মারো, অধিকার আদায়ের সংগ্রাম করো, ভোটের আগে ভাত চাই”। তখন থেকেই শুরু হলো গণবিপ্লবের গোড়াপত্তন। সেই গণবিপ্লবসহ এরশাদ সরকার পতনের গণবিপ্লব গভীরভাবে দেখেছি। ৫-ই আগস্টের গণবিপ্লবে বিজয়ের পর লুটতরাজ, ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, মারামারি-কাটাকাটি দেখে আওয়ামী লীগ সরকারের একটানা দেড় দশক দেশ শাসনের প্রভূত অবকাঠামো উন্নয়ন এবং মূল্যবোধ, নৈতিকতা, মানবিকতা, অবক্ষয়ের উদ্গীরণে বিকলাঙ্গ, বিকৃত জাতীয় উন্নয়ন দেখলাম। গণভবন ও সংসদ ভবনে রক্ষিত জাতির সম্পদ, জনগণের সম্পদ কিভাবে লুটতরাজ হচ্ছিল, তাও মিডিয়ার সুবাদে অবলোকন করলাম। কারফিউ ভেঙ্গে বিপ্লবের জন্য বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় যতো মানুষ এসেছিলেন, বিপ্লব করার জন্য এতো বিপুল মানুষ প্রয়োজন হয় না। এতো মানুষ কেন এসেছিলো, কারফিউ এর মধ্যে যানবাহনবিহীন রাজপথে রাজাকে উচ্ছেদ করার জন্য এতো আগ্রহ কেন। কারণ, মনের ক্ষুধা, বিবেকের তাড়না, খালি পাকস্থলী। শাসক গোষ্ঠী মিডিয়ার সাহায্যে এমন এমন বাক্য চয়ন করতেন, কথা বলতেন যাতে প্রত্যক্ষদর্শীরা লজ্জা পেতেন, মিথ্যাচারকারীরা কোনো লজ্জা পেতেন না। লজ্জা সৌন্দর্য, লাবণ্য এবং মানবতার আচ্ছাদন। বর্তমান লুটতরাজকারীগণেরও লজ্জা নাই, এই লজ্জাহীনতা তারা শাসকগোষ্ঠী সূত্রেই পেয়েছে। এই লজ্জাহীনরাই ভোটের বুথ নিয়ন্ত্রণ করেছে, অন্যের ভোট নিজে দিয়েছে। এদের কাছে লজ্জা মূল্যহীন। স্যুভিনিউর হিসেবে নিচ্ছি বলে গণভবনের ফুলের টব পর্যন্ত স্বদম্ভে লুট করছে।


অর্থনীতিবিদদের মতে, বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্ণর, Financial Intelligence বিভাগের প্রধান, যিনি বগুড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ছিলেন, একান্ত বৈঠকে জানালেন, প্রায় ১৪ লক্ষ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। আমাকে এখানে বসানো হয়েছে এগুলো বন্ধ করার জন্য। কিন্তু চুনো-পুঁটিদেরকে ধরার সম্মতি থাকলেও রাঘব-বোয়ালদের ধরার সম্মতি নাই। তাই বিবেকের দংশন সহ চাকরি করছি, মাস দুই পরেই অবসরে যাবো, শান্তিতে থাকব। অবকাঠামো উন্নয়নের আঞ্জাম দ্বারা এমন অপকীর্তি নাই যে তা হয় নাই। Indemnity সহ ব্যবসা দেওয়া (Quick Rental, Capacity Charge), বুর্জোয়া বান্ধব নীতিমালা-বিধিমালা প্রণয়ন করা, আইয়ূব খানের আমল অনুসরণে জেলা পরিষদ নির্বাচন করা, Cyber Security/Digital Security, বিশেষ ক্ষমতা আইন ইত্যাদি প্রয়োগে স্বাধীন মতামত, দ্বিমত করার দক্ষতাকে দূরে নিক্ষেপ করা, দুর্নীতি করার দ্বারা সুবিধা সৃষ্টি করা ইত্যাদির ফলে প্রায় প্রত্যেক মানুষের সাদা টাকা অপেক্ষা কালো টাকা ঢের বেশি। কালো টাকা কমাতে হলে, আটো করতে হল

দৈনিক বিজয় নিউজ/ এম এ খালেক খান