হামলার লক্ষ্য হাদি নন, সামনের নির্বাচন: রাজনৈতিক বিশ্লেষণ
দৈনিক বিজয় নিউজ নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকাঃ
শরিফ ওসমান হাদির ওপর হামলাকে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করার কোনো সুযোগ নেই। এটি একটি সুনির্দিষ্ট বার্তা। বার্তাটি স্পষ্ট: রাজনৈতিক মাঠে যে স্বাধীন কণ্ঠস্বর বড় দলগুলোর সরাসরি ছায়াতলে নেই, তাকে নির্মমভাবে দমিয়ে দাও। এতে ঝুঁকি কম, লাভ বেশি।
ঘটনাটি ঘটেছে ১২ ডিসেম্বর ২০২৫, পল্টন থানার বিজয়নগর বক্স কালভার্ট এলাকায়, দিনের আলোতে, জুমার নামাজের পরপরই। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনাতেও সময়টি জুমার পরবর্তীই উল্লেখিত হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, মোটরসাইকেল আরোহীরা গুলিবর্ষণ করে পালিয়েছে। হাদি জুলাইয়ের গণ-আকাঙ্ক্ষার ধারক প্ল্যাটফর্ম ‘ইনকিলাব মঞ্চ’-এর মুখপাত্র এবং ঢাকা-৮ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রচারণায় নিয়োজিত ছিলেন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
এখানে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক দিক হলো সময়নির্ধারণ। নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই এমন একটি সশস্ত্র হামলা। এটিকে ‘সাধারণ অপরাধ’ আখ্যা দিয়ে উড়িয়ে দিলে বাস্তবতার সাথে সুবিচার হবে না। প্রতিবেদন স্পষ্ট করছে, তফসিল ঘোষণার অব্যবহিত পরই এই ঘটনা ঘটেছে, আর দেশ তখন ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে। এই সংবেদনশীল মুহূর্তে একজন পরিচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হলো ‘এক ঢিলে অনেক পাখি মারার’ কৌশল। এর ফলে জনমনে আতঙ্ক বাড়বে, রাজনৈতিক দলগুলো পরস্পরকে সন্দেহের চোখে দেখবে, প্রতিক্রিয়ার ভাষা আরও রুঢ় হবে এবং রাজনৈতিক মাঠ আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠবে। নির্বাচনপূর্ব বাংলাদেশে অস্থিরতা সৃষ্টি করার চেয়ে কার্যকর হাতিয়ার আর খুব কমই আছে।
হাদিকে টার্গেট করার যুক্তিও এখানেই নিহিত। তিনি বিএনপি বা জামায়াতের মতো বড় দলগুলোর আনুষ্ঠানিক কর্মী নন। ইনকিলাব মঞ্চ নিজেকে একটি স্বতন্ত্র প্ল্যাটফর্ম হিসেবে উপস্থাপন করে, হাদিও সে পরিচয়ই দেন। ফলে তাকে আঘাত করলে কোনো নির্দিষ্ট দল ‘দলীয় হামলা’ বলে তৎক্ষণাৎ তাদের পুরো যন্ত্রাংশ নিয়ে সাড়া দেবে না, কিন্তু জনমানসে এর প্রভাব হবে গভীর। কারণ, হাদি দীর্ঘ সময় ধরে জনসমক্ষে সক্রিয় ছিলেন, স্পষ্টভাষী ছিলেন, তার অনেক বক্তব্যের সাথে কেউ সহমত তো কেউ বিরোধিতা করলেও, মানুষ তাকে শুনত। এই শোনা, এই দৃশ্যমানতা, এই আবেগই তাকে একটি ‘হাই-ভ্যালু টার্গেট’-এ পরিণত করেছিল।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ‘নিরপেক্ষ’ বা ‘স্বতন্ত্র’ পরিচয় যতটা গৌরবের, ততটাই বিপজ্জনন। দলীয় রাজনীতির প্রত্যক্ষ ছত্রছায়ায় না থাকলে আপনি স্বাধীন হন, কিন্তু একাকীও পড়ে যান। নিরাপত্তা, সংগঠনের শক্তি, শৃঙ্খলা ও পাল্টা চাপ তৈরির সামর্থ্য—একাকীত্বে এসবই দুর্বল হয়ে পড়ে। হাদির ক্ষেত্রেও এই একাকীত্বের সুবিধা ও বিপদ দুই-ই কাজ করেছে।
এখন প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, রাষ্ট্র এ সময় কোথায় ছিল? ৫ আগস্ট ২০২৪-এ তৎকালীন সরকারের পতনের পর দেশ একটি দীর্ঘ রূপান্তরকালের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সে সময় মানুষের প্রত্যাশা ছিল আইন-শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার হবে, ভয়ের চক্র ভাঙবে, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং নির্বাচিত প্রতিনিধির কাছে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর সম্পন্ন হবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। রাষ্ট্র আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকার বারবার আশ্বাস দিলেও মাঠে মানুষ বারবার অনিশ্চয়তা ও ভয় দেখেছে। তফসিল ঘোষণার পরদিন স্পষ্ট দিনের আলোয় একজন প্রার্থী ও জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মের মুখপাত্রের ওপর গুলি চালানো সেই অনিশ্চয়তাকেই নগ্নভাবে উন্মোচিত করেছে।
রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এসেছে। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় দ্রুত তদন্ত ও দোষীদের গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছে। পুলিশও ‘ম্যানহান্ট’ পরিচালনার কথা বলছে। কিন্তু সমস্যা শুধু নির্দেশ জারিতেই নয়, সমস্যা হলো বিশ্বাসে। মানুষ কাগজে-কলমের নির্দেশ দেখে না, মানুষ রাস্তায় প্রকৃত নিরাপত্তা দেখে। মানুষ দেখে, নির্বাচনী মাঠে কে নির্ভয়ে হাঁটতে পারছে, আর কে ভয়ে পিছু হটছে। এই প্রেক্ষাপটে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক সমীকরণের দিকে দৃষ্টি দিতে হয়। বাংলাদেশ এখন দু’টি বড় জটিলতার মধ্যবর্তী অবস্থানে দাঁড়িয়ে। একদিকে, আওয়ামী লীগ-বিরোধী শক্তিগুলো দলের ‘চূড়ান্ত পরাজয়’ চায়, অন্যদিকে আওয়ামী লীগপন্থীরা রাজনীতিতে তাদের অবস্থান পুনরুদ্ধার করতে চায়। যখন এই দুই জটিলতা প্রতিশোধের ভাষায় কথা বলে, তখন রাষ্ট্রের দায়িত্ব ছিল মধ্যস্থতাকারী ও সংরক্ষকের ভূমিকা পালন করা। কিন্তু গত দেড় বছরের বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহে প্রায়শই দেখা গেছে, রাষ্ট্র অনেক সময় জনগণের একাংশের আবেগের পিছু নিতে গিয়ে সক্রিয় ভূমিকা নিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি।
৫ আগস্টের পর বাংলাদেশকে একটি গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়ার প্রথম ধাপ হিসেবে দেখা যায় ৩২ নম্বর বাড়িটি ভেঙে ফেলা। গণ-অভ্যুত্থানের পাঁচ মাস পর, ২০২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি, একদল লোক সেটি ভাঙচুর করে এবং পরবর্তীতে তা সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দেয়। সে ঘটনায় রাষ্ট্রের নির্লিপ্ততা ও নিয়ন্ত্রণহীনতা একদিকে যেমন প্রতিশোধের রাজনীতিকে উসকে দিয়েছে, অন্যদিকে আওয়ামী লীগকে একটি ‘শহিদ’ প্রতীকে পরিণত করতে সহায়তা করেছে। বাংলাদেশকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়ার সম্ভাব্য দ্বিতীয় ধাপ হতে পারে জুলাই আন্দোলনের পরিচিত মুখ শরিফ ওসমান হাদির ওপর এই নৃশংস হত্যাচেষ্টা। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি ‘পতিত শক্তি’র কাছ থেকে হত্যার হুমকি পাচ্ছিলেন বলে জানিয়েছিলেন। সারাদেশের মানুষ তার সুস্থতা কামনা করছে। তিনি এখনও আশঙ্কাজনক অবস্থায় রয়েছেন। তাঁকে হারানোয় প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। জুলাই অভ্যুত্থানের ধারক শক্তি ও পতিত শক্তি এক অনন্ত সংঘর্ষের দিকে যেতে পারে, যার পরিণতি অকল্পনীয়।
আতঙ্কের আরেকটি কারণ, এই হামলা ঘটেছে এক অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ সময়ে, যখন নির্বাচন নিয়ে ইতিমধ্যে গভীর অবিশ্বাস ও সন্দেহ কাজ করছে, এবং ‘কে নির্বাচন বানচাল করতে চায়’—এ প্রশ্ন বাতাসে ভাসছে। ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচনের তফসিল ঘোষিত হয়েছে, দেশ একটি টানটান রাজনৈতিক অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। এই টানটান সময়ের প্রথম বড় আঘাত যদি এমন হয়, তবে সামনে আরও ভয়াবহ ঘটনা অসম্ভব নয়। এ পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের কাছে প্রত্যাশা স্পষ্ট: এই ঘটনার তদন্ত নামে দীর্ঘসূত্রিতার নাটক মঞ্চায়ন চলবে না। এখানে শুধু অপরাধী শনাক্ত করার প্রশ্নই নয়, রাষ্ট্রের সক্ষমতা ও সদিচ্ছা প্রমাণের প্রশ্ন জড়িত। সরকারকে এখনই কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে:
এক, হাদি হামলা মামলার তদন্তের অগ্রগতি নিয়মিত ও স্বচ্ছভাবে জনগণকে জানাতে হবে, যাতে গুজব ও ষড়যন্ত্র তত্ত্বের বিস্তার রোধ হয়।
দুই, নির্বাচনী মাঠে সকল প্রার্থী ও রাজনৈতিক কর্মীর নিরাপত্তার জন্য কাগুজে ঘোষণা নয়, বাস্তবে দৃশ্যমান ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
তিন, উত্তেজনা বৃদ্ধি রোধে সরকারকে প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ রক্ষা করে চলতে হবে, ন্যূনতম সংযম ও শিষ্টাচার বজায় রাখতে সবার সাথে সমঝোতা করতে হবে এবং যেকোনো উসকানির মুখে নির্বাচনী পরিবেশ শান্তিপূর্ণ রাখার জন্য সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
চার, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সরকারকে নিরপেক্ষতার অভিনয় নয়, প্রকৃত নিরপেক্ষতা ও ন্যায়বিচারের পরিচয় দিতে হবে। কোনো পক্ষের আবেগ বা চাপের কাছে নতি স্বীকার করা পরবর্তীতে রাষ্ট্রকেই বিপদের মুখে ফেলবে।
সবশেষে একটি প্রশ্ন থেকে যায়: তফসিল ঘোষণার পরের দিনের এই গুলির শব্দ কি শুধু একজন মানুষকে আঘাত করেছে, নাকি সমগ্র নির্বাচনী প্রক্রিয়া, শান্তি ও ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনাকে আঘাত করেছে? এর উত্তর স্পষ্ট। এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রার ওপর এক সুপরিকল্পিত আঘাত। যদি রাষ্ট্র এই আঘাতের পরেও ‘সবকিছু নিয়ন্ত্রণে’ এরূপ ভাবভঙ্গি প্রদর্শন করে, তবে সামনে যে অন্ধকার অপেক্ষা করছে, তাকে ঠেকানো কারও পক্ষে সম্ভব হবে না।
আসিফ বিন আলী
শিক্ষক, গবেষক ও স্বাধীন সাংবাদিক
বর্তমানে যুক্তরাজ্যের জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটিতে কর্মরত।
দৈনিক বিজয় নিউজ/ ই