রমজানের যে ইবাদতের কথা আমরা মনে রাখি না
দৈনিক বিজয় নিউজ বিশেষ প্রতিনিধিঃ
রমজান এলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে তারাবির দীর্ঘ সারি, সাহরি-ইফতারের আয়োজন, কোরআন তিলাওয়াতের সুমধুর ধ্বনি আর দুস্থদের মাঝে দান-সদকার ছবি। এসব দৃশ্যমান ইবাদত নিঃসন্দেহে রমজানের প্রাণ এবং এতে রয়েছে অফুরন্ত সওয়াব।
কিন্তু এই বাহ্যিক আয়োজনের আড়ালে রমজানের আরও একটি গভীর, নীরব মাত্রা লুকিয়ে আছে। তা আমাদের করা কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আমরা যা ইচ্ছাকৃতভাবে ‘করি না’ বা বর্জন করি, তার মাধ্যমেও তা প্রকাশ পায়।
ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) ইবাদতের এই ব্যাপক অর্থটি ফুটিয়ে তুলেছেন। তার মতে, “ইবাদত একটি বিস্তৃত ধারণা, যা আল্লাহ পছন্দ করেন এবং যা তাঁকে সন্তুষ্ট করে—তা প্রকাশ্য হোক বা গোপন, অন্তরের কাজ হোক, জিহ্বার কিংবা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের।” (মাজমু আল-ফাতাওয়া, ১০/১৪৯)
অর্থাৎ, ইবাদত শুধু কিছু করা নয়, আল্লাহর জন্যই কিছু কাজ থেকে সচেতনভাবে বিরত থাকাও এক মহান ইবাদতে পরিণত হয়।
রোজা মানে শুধু না খাওয়া নয়
রোজার মূল দর্শন বুঝিয়ে দিয়ে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, “হে মুমিনগণ, তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর; যাতে তোমরা তাকওয়া (আল্লাহভীতি) অর্জন করতে পারো।” (সুরা বাকারা, ১৮৩)
‘সাওম’ শব্দের অর্থই হলো বিরত থাকা। ইসলামী পরিভাষায় তা সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নিয়তের সঙ্গে পানাহার ও দাম্পত্য মিলন থেকে বিরত থাকার নাম। তবে লক্ষ্য শুধু ক্ষুধার্ত থাকা নয়; বরং তাকওয়া অর্জনই এর চূড়ান্ত উদ্দেশ্য।
ইমাম গাজালি (রহ.) এ প্রসঙ্গে গভীরভাবে বলেন, “রোজা কেবল পানাহার ত্যাগ করা নয়, বরং সকল প্রকার পাপাচার থেকেও বিরত থাকা—জিহ্বার সংযম, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের পবিত্রতা ও হৃদয়ের একনিষ্ঠতা।” (ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন, ১/২৩১)
রোজার তিনটি স্তর
ইবনে কুদামা আল-মাকদিসি রোজার তিনটি স্তরের কথা উল্লেখ করেছেন, যা আমাদের আত্মশুদ্ধির পথ দেখায়:
১. সাধারণ মানুষের রোজা: শুধু খাবার ও যৌনাচার থেকে বিরত থাকা।
২. ধর্মভীরুদের রোজা: চোখ, কান, জিহ্বা, হাত ও পাকে সমস্ত পাপাচার থেকে বাঁচানো।
৩. বিশিষ্টজনদের রোজা: অন্তরকে সব রকমের নীচ চিন্তা ও আল্লাহবিমুখতা থেকে মুক্ত রাখা। (মুখতাসার মিনহাজুল কাসিদিন, পৃ. ৪৪)
রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করেছেন, চারিত্রিক শুদ্ধি না এনে শুধু না খেয়ে থাকার কোনো মূল্য নেই। তিনি বলেন, “যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও সে অনুযায়ী কাজ করা ছাড়ল না, তার পানাহার ত্যাগ করার মধ্যে আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।” (সহিহ বুখারি, ১৯০৩)
নীরবতার শক্তি ও ডিজিটাল সংযম
রমজান আমাদের জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণের শিক্ষা দেয়। অপ্রয়োজনীয় কথা হৃদয়কে কঠিন করে দেয়। আল্লাহ স্মরণ করিয়ে দেন, “সে যাই বলবে, তাই লিপিবদ্ধ করার জন্য তার সঙ্গেই আছে এক প্রস্তুত প্রহরী।” (সুরা কাফ, ১৮)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, “যে আল্লাহ ও শেষ দিনের ওপর বিশ্বাস রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে বা চুপ থাকে।” (সহিহ বুখারি, ৬০১৮)
গিবত, পরনিন্দা বা অহেতুক বিতর্ক থেকে বিরত থাকা এই মাসের এক অনন্য ইবাদত। আর বর্তমান ডিজিটাল যুগে এই সংযমের পরিধি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রসারিত। অহেতুক স্ক্রলিং, অনর্থক কৌতূহল ও আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে নেওয়া ডিজিটাল আসক্তি বর্জন করাই আধুনিক সময়ের ‘অন্তরীয় রোজা’।
আল্লাহ বলেন, “যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তার পেছনে পড়ো না। নিশ্চয়ই কান, চোখ ও হৃদয়—এদের প্রতিটি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে।” (সুরা বনি ইসরাইল, ৩৬)
ব্যস্ত জীবনে রমজানের আমল
কর্মজীবী মানুষের জন্য রমজানের সংযম মানে কর্মক্ষেত্রে সততা বজায় রাখা, ধৈর্যধারণ করা, পরনিন্দা এড়িয়ে চলা—এসবই তাঁর ইবাদতে পরিণত হয়।
গৃহিণী ও মায়েদের জন্য ইফতার ও সাহরির এই নিরলস আয়োজন, যদি ধৈর্য ও খাঁটি নিয়তে করা হয়, তা শ্রেষ্ঠ ইবাদত।
শিক্ষার্থীদের জন্য পড়াশোনার চাপে রোজা রেখেও ধৈর্য ধরা ও অসততা বর্জন করা আত্মশুদ্ধির এক মহড়া।
রাসুলুল্লাহ (সা.) ছোট কাজকেও তুচ্ছ মনে করতে শেখাননি। এমনকি ভাইয়ের সঙ্গে হাসিমুখে সাক্ষাৎ করাকেও তিনি সদকা বলে গণ্য করেছেন। (সহিহ মুসলিম, ২৬২৬)
আল্লাহর কাছে সেই আমলই সবচেয়ে প্রিয় যা পরিমাণে কম হলেও নিয়মিত করা হয়। (সহিহ বুখারি, ৬৪৬৫)
রমজান আমাদের শিক্ষা দেয়, কোনো কিছু না করা সব সময় ক্ষতির নয়, বরং তা বিরাট রহমতও বয়ে আনতে পারে। যখন আমরা ভোগের নেশা, ক্রোধের প্রতিক্রিয়া আর অনর্থক কথা বলা থেকে নিজেদের সচেতনভাবে বিরত রাখি, তখন আমাদের আত্মা পরিশুদ্ধ হয়।
রমজান শেষে যখন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাই, তখন যদি এই ‘সংযমের পজ’ বা বিরতি নেওয়ার অভ্যাসটি আমাদের মধ্যে অটুট থাকে, তবেই আমরা সত্যিকার অর্থে রমজানের শিক্ষাকে সার্থক করতে পেরেছি।
দৈনিক বিজয় নিউজ/ মোঃ নাঈম আহমেদ