এক রাতেই ইরানকে নিশ্চিহ্ন করার হুমকি ট্রাম্পের, অনড় তেহরান
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ
দৈনিক বিজয় নিউজ নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকাঃ আল–জাজিরা
পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কাছে একটি পরিকল্পনা পাঠিয়েছে—মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ বন্ধ করতে এবং জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করতে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, এই পরিকল্পনা ‘যথেষ্ট ভালো নয়’। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ইরানকে এক রাতেই নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া সম্ভব, আর স্থানীয় সময় মঙ্গলবার রাতই সেই রাত হতে পারে। অন্যদিকে তেহরান জানিয়েছে, তারা অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি নয়, যুদ্ধের পুরোপুরি অবসান চায়। আর হরমুজ প্রণালি শিগগির খোলার সম্ভাবনাও নেই।
ঠিক সেই সময়ই পাকিস্তানের এই পরিকল্পনার খবর সামনে এল, যখন ট্রাম্পের দেওয়া আলটিমেটাম শেষ হওয়ার পথে—যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় আজ রাত ৮টা (বাংলাদেশ সময় বুধবার সকাল ৬টা)। এর আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, চুক্তি না হলে এবং হরমুজ না খুললে ইরানে ‘নরক নেমে আসবে’, সেখানে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুতে হামলা চালানো হবে।
যুদ্ধ থামাতে ইরান ইতিমধ্যে কয়েক দিন ধরে জোর কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছিল। কারণ এই যুদ্ধ বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি করেছে। হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ থাকায় জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে—গতকাল ব্যারেলপ্রতি দাম ছিল ১১০ ডলার। এ ছাড়া যুদ্ধের ৩৮তম দিনে গতকাল ব্যাপক পাল্টাপাল্টি হামলায় ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের সংখ্যা আরও বেড়েছে।
পাকিস্তানের পরিকল্পনায় কী আছে
রয়টার্সকে দেওয়া এক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের পাঠানো পরিকল্পনায় দুটি ধাপ রয়েছে। প্রথম ধাপে সঙ্গে সঙ্গেই যুদ্ধবিরতি শুরু হবে এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে হবে। দ্বিতীয় ধাপে ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত একটি চুক্তি হবে, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ইসলামাবাদ চুক্তি’। গত রোববার রাতে পরিকল্পনাটি দুই পক্ষের কাছে যায়।
সূত্র জানায়, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির রোববার রাতভর যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। তবে এ বিষয়ে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দরাবি রয়টার্সকে কোনো মন্তব্য করেননি।
এর আগে রোববার মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস একই ধরনের প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে মধ্যস্থতাকারীদের বরাতে বলা হয়, ইরান ও মধ্যস্থতাকারীরা দুই ধাপের একটি চুক্তি নিয়ে আলোচনা করছেন—প্রথম ধাপে ৪৫ দিনের সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি, পরে আলোচনার মাধ্যমে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি।
হরমুজ খুলতে রাজি নয় ইরান
হরমুজ প্রণালি খোলার বিষয়ে ইরান আগে থেকেই আপত্তি জানিয়ে আসছে। সম্প্রতি তেহরান বলেছিল, অন্যদের জন্য শর্ত সাপেক্ষে প্রণালি খোলা যেতে পারে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য তা স্থায়ীভাবে বন্ধ থাকবে। গতকাল ইরানের এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবেও তারা হরমুজ খুলবেন না, এবং কোনো সময়সীমা মেনে নেবেন না।
প্রাথমিক যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবও মানতে নারাজ তেহরান। তাদের ধারণা, এই বিরতি ‘শত্রুদের’ নতুন করে প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ দেবে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাগেরি বলেন, তারা যুদ্ধ পুরোপুরি বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে আবার নতুন করে যুদ্ধ শুরু না হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার তিক্ত অভিজ্ঞতাও তাদের রয়েছে।
‘যথেষ্ট ভালো নয়’ যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব
পশ্চিমা মিত্রদের পাশে না পাওয়া এবং নিজ দেশের অভ্যন্তরীণ চাপের কারণে ট্রাম্প নিজেই চুক্তির ওপর জোর দিচ্ছিলেন। তবে গতকাল হোয়াইট হাউসের এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘তারা একটি প্রস্তাব দিয়েছে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব, একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কিন্তু যথেষ্ট ভালো নয়।’ পরে হোয়াইট হাউসে ইরান যুদ্ধ সংক্রান্ত সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও বলেন, মার্কিন বাহিনী চাইলে মাত্র এক রাতেই পুরো ইরানকে ‘নিশ্চিহ্ন’ করে দিতে পারে। ‘আর মঙ্গলবার রাতই সেই রাত হতে পারে।’
এর আগে ইরানে ভূপাতিত হওয়া মার্কিন যুদ্ধবিমানের পাইলটদের উদ্ধারকে ট্রাম্প ‘ঐতিহাসিক’ বলে উল্লেখ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্পের পর মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সোমবার ইরানে সবচেয়ে বেশি হামলা চালানো হবে। আর মঙ্গলবার (আজ) তার চেয়েও বেশি হামলা হবে—যদিও তিনি আগেও এমন হুমকি দিয়েছেন।
ব্যাপক পাল্টাপাল্টি হামলা
এসব হুমকির আগেই গতকাল, যুদ্ধের ৩৮তম দিনে, ব্যাপক পাল্টাপাল্টি হামলা হয়েছে। ইরানের হামলায় উত্তর ইসরায়েলের হাইফা শহরে বড় ক্ষয়ক্ষতি হয়, নিহত হন চারজন। তেল আবিবসহ মধ্য ইসরায়েলের অন্তত ২৮টি স্থানে হামলা হয়েছে। এদিন লেবানন, সৌদি আরব, বাহরাইন ও ইরাক থেকেও হামলার খবর পাওয়া গেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গতকাল তেহরানের শরিফ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজিতে বোমা হামলা চালায়। ইরানের আসালুয়েহ এলাকায় পেট্রোকেমিক্যাল কারখানায়ও হামলা হয়। তেহরানের বাহারেস্তান এলাকায় হামলায় ১৫ জন নিহত হন। এদিন ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ডের (আইআরজিসি) গোয়েন্দাপ্রধান সায়েদ মাজিদ খাদেমিও নিহত হন।
মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএনএ জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর ইরানে সাড়ে তিন হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। এমন সহিংসতার মধ্যেই এক ইরানি তরুণ বিবিসিকে বলেন, ‘মনে হচ্ছে আমরা চোরাবালিতে আটকে যাচ্ছি। আমরা সাধারণ মানুষ আর কী-ই বা করতে পারি? ট্রাম্পকে তো থামাতে পারব না।’