উনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চলমান সহিংসতা ও হতাহতের ঘটনা দেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য নিঃসন্দেহে উদ্বেগের বিষয়।
নৌকার ভরাডুবি, মনোনয়ন বাণিজ্যে জড়িতদের জন্য রেড এলার্ট!
উনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চলমান সহিংসতা ও হতাহতের ঘটনা দেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য নিঃসন্দেহে উদ্বেগের বিষয়। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে নির্বাচন সম্পর্কে দেশের মানুষের মনে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হবে বা হচ্ছে। ইউপির দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপের নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ৬০ জনের বেশি নিহত হয়েছেন।
গত ১১ নভেম্বর দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনে ভোট গ্রহণের সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে এবং এতে ৭ জন নিহতসহ আহত হয়েছেন শতাধিক। এদিন নরসিংদীর রায়পুরায় তিনজন, কুমিল্লার মেঘনায় দুইজন, চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে একজন, গাজিপুরে একজন এবং কক্সবাজারে একজন নিহত হয়েছেন। গত ১২ নভেম্বর সকালে রাজবাড়ীর বাণীবহতে একজন সাবেক চেয়ারম্যানকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।
এর আগে,বগুড়া, মায়মনসিংহ, নরসিংদী, মাগুরা, রাঙামাটি, ফরিদপুর, সিলেটসহ বিভিন্ন স্থানে নির্বাচনী সহিংসতায় হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় নিহতের পাশাপাশি আহত হয়েছেন কয়েকশত মানুষ। অতীতে ইউপি নির্বাচনে হতাহতের ঘটনা ঘটলেও এবারের মতো এতো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। সারা দেশে প্রায় পাঁচ হাজার ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে ভোট গ্রহণ চার থেকে পাঁচ ধাপে অনুষ্ঠিত হবে। প্রথম এবং দ্বিতীয় ধাপ পার হতেই এতো রক্তপাতের ঘটনা মারাত্মক উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে পরবর্তী ধাপগুলো ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
এবারের নির্বাচনে অধিকাংশ ইউপিতেই আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়েছে আওয়ামী লীগ। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থীর বিরোধীতা করে অনেক স্থানে একাধিক বিদ্রোহী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বী হয়েছেন। নির্বাচনে আধিপত্য বিস্তারে এই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের গ্রুপগুলো রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে। ইউপি নির্বাচনে এই সংঘর্ষ সহিংসতা ঠেকাতে নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসন ব্যর্থ হয়েছে। এক্ষেত্রে ইসি এবং প্রশাসনের সমন্বয়হীনতা ও নিস্ক্রিয়তা রয়েছে। তাছাড়া নিজ দলের সহিংসতা ঠেকাতে আওয়ামী লীগেরও ব্যর্থতা রয়েছে।
স্থানীয় সরকারের একেবারে তৃণমূল পর্যায়ে রয়েছে ইউপি। তাই এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রতিটি গ্রাম পর্যায়ে এমনকি পাড়া-মহল্লার মানুষ বেশি তৎপর থাকে। এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের জন্য জন্য সবাই চায় তাদের পছন্দের মানুষটি যেন ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। আর এতেই বিপত্তি ঘটে। বিশেষ করে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হওয়ায় এবং বিএনপিসহ কিছু রাজনৈতিক দল এ নির্বাচন দলগতভাবে বর্জন করায় সরকারি দল আওয়ামী লীগের প্রতীক নৌকা যারা পাচ্ছেন তাদের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছেন একই দলের বিদ্রোহী প্রার্থীরা। অধিকাংশ ইউপিতেই দলীয় প্রতীক না পেয়ে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীরা বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েও অনেক জায়গায় ভোটে জিতেও যাচ্ছেন। এ পরিস্থিতিতে তৃণমূল পর্যায়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হওয়ায় সরকারি দল আওয়ামী লীগ সম্পর্কে জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হচ্ছে। তাই দেশব্যাপী চলমান ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নিজেদের মধ্যে সংঘাত-সহিংসতা বেড়ে যাওয়ার কারণে সরকার ও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ বিব্রত।
দলীয় প্রতীকে ইউপি নির্বাচন হওয়ায় অনেক সময় সবচেয়ে যোগ্য প্রার্থী বিজয়ী না হয়ে অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রার্থী চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে যান। এর ফলে তৃণমূল পর্যায়ের মানুষ সঠিক জনপ্রতিনিধি না পাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হন। কখনও কখনও অধিকতর সৎ, শিক্ষিত, মেধাবী ও যোগ্য প্রার্থী দলীয় প্রতীক না পেয়ে নির্বাচন থেকেই সরে দাঁড়ান। আবার দলের কোন পদে নেই কিন্তু দলের সমর্থক এলাকার অনেক জনপ্রিয় লোক ইচ্ছে করলেও দলীয় প্রতীক না পাওয়ায় নির্বাচন করতে পারেন না। এর ফলে অনেক ভাল মানুষ স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি হওয়া থেকে বঞ্চিত হন।
দেশে প্রায় ৫ হাজার ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে। তাই বর্তমান পদ্ধতিতে দলীয় প্রতীকে প্রার্থী করতে গিয়ে সরকারী দল প্রত্যেকটি ইউপিতেই নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করে ফেলছে। তবে প্রতীক ছাড়া ভোট হলে বিদ্রোহী প্রার্থী থাকবে না। তাই নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভাজনও সৃষ্টি হবে না। সে ক্ষেত্রে দল সমর্থক যোগ্য একাধিক প্রার্থী নিজ নিজ অবস্থান থেকে নির্বাচন করতে পারবেন এবং যে প্রার্থী অধিকতর যোগ্য স্থানীয় জনগণ তাকেই নির্বাচিত করবে। এতে তৃণমূল পর্যায়ে গণতন্ত্র চর্চার পথ সুগম হবে। এ ছাড়া স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা এবং সংসদ সদস্যরা প্রার্থী বাছাই করতে গিয়ে বিরোধে জড়ানোর সুযোগ পাবেন না।
দল মনোনীত প্রার্থীদের এমন বিপর্যয়ে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে তোলপাড় চলছে। বিষয়টি ভাবিয়ে তুলেছে নির্বাচন সচেতন মহলকেও। অর্ধেকেরও বেশি ইউনিয়নে দলীয় প্রার্থীর হারের পর্যালোচনা শুরু হয়েছে। আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের ভরাডুবির কারণ খুঁজতে গিয়ে দলীয় নেতাকর্মী, ভোটার, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী এবং রাজনৈতিক সচেতন মহলের সঙ্গে কথা হয়। তাদের বিশ্লেষণে আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের পরাজয়ের পেছনে কয়েকটি কারণ উঠে এসেছে। কারণগুলো হচ্ছে- সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য প্রার্থী না দেওয়া, বিদ্রোহ দমাতে ব্যর্থতা, নৌকার বিরোধিতায় বিএনপি ও তাদের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কৌশলী প্রচারণাও ভোটারদের কাবু করেছে। অনেক জায়গায় মনোনয়ন বাণিজ্যের কারণে অযোগ্য লোককে নৌকার মাঝি করা হয়েছে যার কারণে মূলত এমন ভরাডুবি।
অধিকাংশ প্রভাবশালীর এলাকায় নৌকার ভরাডুবি হয়েছে। তবে দল আওয়ামী লীগের পরাজয় হয়নি, পরাজয় হয়েছে মনোনয়ন বাণিজ্যের। যারা মনোনয়ন পেয়েছে তারা কোন এক প্রভাবশালীকে ম্যানেজ করে পেয়েছে। এই কারণে জনগণ বাণিজ্যের মনোনয়নের বিরুদ্ধে তাদের রায় দিয়েছে। যারা স্বতন্ত্র হিসেবে বিজয়ী হয়েছে তারা সবাই আওয়ামী লীগ করেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে জনগণ জেগেছে। তারা বুঝেশুনে তাদের রায় দিয়েছে। দলের মধ্যে যারা মনোনয়ন বাণিজ্যে জড়িত তাদের জন্য নিঃসন্দেহে এটা একটা রেড এলার্ট। সামনের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কড়া দামে মনোনয়ন বাণিজ্যের দাম চুকাতে হবে।
দৈনিক বিজয় নিউজ/ডব্লিউবি