নদী ও পরিবেশ রক্ষায় ২০ দফা দাবি: রাজশাহীতে মানববন্ধনে কঠোর কর্মসূচির ঘোষণা
দৈনিক বিজয় নিউজ বিশেষ প্রতিনিধিঃ
রাজশাহীতে নদী, গাছপালা ও পরিবেশ রক্ষায় ২০ দফা দাবিতে মানববন্ধন ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) সকালে নগরীর সাহেববাজার জিরোপয়েন্টে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে বিভিন্ন সামাজিক, পরিবেশবাদী ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতাকর্মীরা অংশ নেন। ‘নদী ও পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন, বাংলাদেশ’-এর উদ্যোগে আয়োজিত এ কর্মসূচি সকাল সাড়ে ৯টায় শুরু হয়। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক হোসেন আলী পিয়ার সঞ্চালনায় এবং সভাপতি অ্যাডভোকেট এনামুল হকের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট চিকিৎসক, পরিবেশবিদ, সাংবাদিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতারা। বক্তারা বলেন, “উন্নয়নের নামে নির্বিচারে গাছ কাটা ও পরিবেশ ধ্বংসের প্রবণতা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। পরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন নিশ্চিত না করলে রাজশাহীসহ দেশের সামগ্রিক পরিবেশ ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। তারা উল্লেখ করেন— নগরীর অবশিষ্ট গাছ সংরক্ষণে জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। এক বছরের মধ্যে অন্তত ১ লাখ ফলজ ও ঔষধি গাছ রোপণের পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে পরিবেশবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে।
সমাবেশে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয় রাজশাহীর প্রধান নদীগুলোর অস্তিত্ব রক্ষার ওপর। বক্তারা বলেন, পদ্মা নদীসহ মহানন্দা, বারানই, নারদ, বারাহী ও নারায়ণী নদী দিন দিন নাব্যতা হারাচ্ছে এবং দখল-দূষণের কারণে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। তাদের দাবির মধ্যে ছিল— অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ নদী দখলমুক্ত করা, খননের মাধ্যমে নাব্যতা ফিরিয়ে আনা, নদীভিত্তিক টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা বক্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা International Union for Conservation of Nature (IUCN)-এর একাধিক প্রতিবেদনে জলবায়ু পরিবর্তন ও পানি ব্যবস্থাপনার সংকটের কারণে ভবিষ্যতে বড় নদীগুলোর অস্তিত্ব ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে। পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য নিয়ে ২০ দফা দাবি। সমাবেশ থেকে উত্থাপিত গুরুত্বপূর্ণ দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে— শব্দদূষণ রোধে নিষিদ্ধ হাইড্রোলিক হর্ন বন্ধ, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক নিষিদ্ধ আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু, উন্মুক্ত ড্রেনের পরিবর্তে স্বাস্থ্যসম্মত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, ইটভাটার পরিবেশগত নিয়ম কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, শিল্পকারখানা ও চামড়া শিল্পের বর্জ্য নদীতে ফেলা বন্ধ, ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত করা, অবৈধ যানবাহন নিয়ন্ত্রণ ও অটোরিকশার ভাড়া নির্ধারণ।
পরিবেশের পাশাপাশি নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতেও জোর দেন বক্তারা। তারা বলেন— রাজশাহীতে অন্তত ২০০ শয্যার একটি আধুনিক শিশু হাসপাতাল স্থাপন জরুরি কৃষিজমি রক্ষায় পুকুর খনন নিয়ন্ত্রণ করতে হবে বিষমুক্ত কৃষি ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে কীটনাশকের ব্যবহার কমাতে হবে ফারাক্কা চুক্তি ও পানি সংকট নিয়ে উদ্বেগবক্তারা বলেন, ফারাক্কা চুক্তি-এর মেয়াদ শেষ হওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশের পানি প্রবাহ ও পরিবেশের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে। তাই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান তারা।
বরেন্দ্র অঞ্চলের জন্য বিশেষ উদ্যোগের দাবি বরেন্দ্র অঞ্চলের পানি সংকট মোকাবেলায় পৃথক পানি ব্যবস্থাপনা নীতি এবং একটি স্বাধীন “বরেন্দ্র উন্নয়ন বোর্ড” গঠনের দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমিয়ে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। সমাবেশ শেষে মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরা “নদী বাঁচাও, পরিবেশ বাঁচাও, রাজশাহী বাঁচাও” স্লোগানে মুখরিত করে তোলেন পুরো এলাকা। তারা জানান, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবেন এবং রাজশাহীর সকল সামাজিক সংগঠনকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। রাজশাহীর পরিবেশ ও নদী রক্ষায় এ ধরনের গণআন্দোলন ক্রমেই জোরদার হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে এ অঞ্চলে পানি সংকট, পরিবেশ বিপর্যয় ও জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
দৈনিক বিজয় নিউজ / মোঃ রাজিব খাঁন