রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলায় মাদক ব্যবসা ও সেবনে বাধা দেওয়ার জেরে এক যুবককে কুপিয়ে গুরুতর জখম

রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলায় মাদক ব্যবসা ও সেবনে বাধা দেওয়ার জেরে এক যুবককে কুপিয়ে গুরুতর জখম
ছবিঃ মোঃ রাজিব খাঁন

দৈনিক বিজয় নিউজ বিশেষ প্রতিনিধিঃ

অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এনেছে উপজেলার মাদক পরিস্থিতিকে। একই সঙ্গে মাদককে কেন্দ্র করে সহিংসতা, চাঁদাবাজি, প্রাণহানি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে স্থানীয়দের উদ্বেগ আরও বেড়েছে। মাদক প্রতিরোধ, তুচ্ছ ঘটনায় হত্যাকাণ্ড এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার বিষয়টি একাধিকবার উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় উঠলেও তা বাস্তবে কার্যকর হচ্ছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসায়ী ও সেবনকারীদের দৌরাত্ম্যে সাধারণ মানুষ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। মাদক নিয়ন্ত্রণে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, পুলিশ ও র‍্যাবের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেকে। অভিযোগ রয়েছে, মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে মাদকসেবীদের আটক করা হলেও তালিকাভুক্ত ও প্রভাবশালী মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা খুব কমই দেখা যায়।

গত ১ জুন রাত আনুমানিক ১০টার দিকে উপজেলার চুনিয়াপাড়া গ্রামের আব্দুল কুদ্দুস (২৮) মাদক সেবনে বাধা দেওয়ার জেরে হামলার শিকার হন বলে অভিযোগ উঠেছে। পরিবারের দায়ের করা মামলায় ৮ জনের নাম উল্লেখসহ আরও ১০-১২ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, মৌগাছি ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা আবুল হোসেন সরদারের ছেলে পায়েল হোসেন (৪০), তার ভাই সন্ধি খান (৩৫) এবং তাদের সহযোগীরা কুদ্দুসকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে আহত করে রাস্তার পাশে ফেলে রেখে যায়। মামলায় অভিযুক্তদের মধ্যে আরও রয়েছেন মুনজুর, ইস্রাফিল, নাদিম উদ্দীন, শুভ ও ইমন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ২৫ মে রাতে মৌগাছি ইউনিয়নের বকপাড়া গ্রামে মোহনপুর উপজেলা ঐক্য প্রেসক্লাবের সভাপতি রাজিব খাঁনের বাড়ির সামনে গিয়ে একদল ব্যক্তি তার কাছে ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করে। অভিযোগ রয়েছে, টাকা না দিলে তাকে হত্যাসহ বাড়িঘরে আগুন দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। রাজিব খাঁনের দাবি, বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশকে জানানো হলেও এখন পর্যন্ত অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। স্থানীয়দের ভাষ্য, মাদক বিস্তার এখন মোহনপুরের প্রায় প্রতিটি ইউনিয়ন ও বাজার এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। মৌগাছি, ধুরইল, বাকশিমইল, জাহানাবাদ, ঘাসিগ্রাম ও রায়ঘাটি ইউনিয়নসহ কেশরহাট পৌর এলাকার বিভিন্ন স্থানে ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিল, ট্যাপেন্টাডল, চোলাই মদ ও রেক্টিফাইড স্পিরিট (কট) বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, মৌগাছি ইউনিয়নের টেমা, বকপাড়া, বিদিপুর, চানপুর, হরিফলা, বাটুপাড়া, মৌগাছি বাজার, ত্রিমোহনী আদিবাসীপাড়া ও মৌপাড়ায় চোলাই মদ, গাঁজা, ইয়াবা ও ফেনসিডিল বিক্রি হচ্ছে। ধুরইল ইউনিয়নের ধুরইল বাজার ও পিয়ারপুর আদিবাসীপাড়ায় চোলাই মদ, গাঁজা ও ট্যাপেন্টাডল বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। জাহানাবাদ ইউনিয়নের ধোপাঘাটা, কুঠিবাড়ি, পাকুড়িয়া, ধোরসা, মতিহার, নজুর মোড় ও বিষুহারা এলাকায় কট, গাঁজা, হেরোইন, ইয়াবা ও চোলাই মদ। বাকশিমইল ইউনিয়নের বড় ভাতুড়িয়া, সইপাড়া, পানচত্বর, মোহনপুর সদর, খাড়ইল মিলঘর, বরইকুড়ি, তেতুলতলা মোড়, পরিজুনপাড়া ও দরুজপাড়ায় গাঁজা, ট্যাপেন্টাডল, ইয়াবা, হেরোইন ও চোলাই মদ বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া ঘাসিগ্রাম ইউনিয়নের ঝালপুকুর আদিবাসীপাড়া, শ্যামপুর, কৃষ্ণপুর ও গোছা এলাকায় ট্যাপেন্টাডল, হেরোইন, ইয়াবা ও চোলাই মদ এবং রায়ঘাটি ইউনিয়নের কামারপাড়া ও শিয়ালকোলা এলাকায় ফেনসিডিল, ইয়াবা ও গাঁজা বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে। কেশরহাট পৌর এলাকার কেশরহাট সদর, হল মোড়, সাকোয়া, বিদিরকা, গোপইল, নাকইল, বিশালপুর ও হরিদাগাছি এলাকায় দিনের বেলাতেও মাদক লেনদেন চলছে বলে দাবি স্থানীয়দের। মোহনপুরের ধোপাঘাটা বাজারকে ঘিরে বিষাক্ত রেক্টিফাইড স্পিরিট বা ‘কট’ ব্যবসার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত বছরে কট সেবন করে একাধিক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। একটি ঘটনায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনজনের মৃত্যু হয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রাণহানির ঘটনার পর কিছুদিন অভিযান জোরদার হলেও পরে পরিস্থিতি আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। মোহনপুরে সাম্প্রতিক সময়ে আধিপত্য বিস্তার, তুচ্ছ ঘটনা এবং মাদককেন্দ্রিক বিরোধকে ঘিরে একের পর এক সহিংসতার ঘটনা ঘটছে বলে দাবি স্থানীয়দের। তাদের অভিযোগ, মাদকের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে চুরি, ছিনতাই, মারামারি, কিশোর গ্যাং, পারিবারিক সহিংসতাসহ নানা অপরাধও বেড়েছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, মাদকসংক্রান্ত বিরোধের জেরে সাব্বির (২১) নামে এক যুবক নিহত হওয়ার ঘটনাও সম্প্রতি আলোচনায় আসে। ওই ঘটনায় একজনকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া একটি সংঘবদ্ধ চক্র গভীর রাতে রাজশাহী-নওগাঁ মহাসড়কে রোড রবারি ও মোটরসাইকেল ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত বলেও অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষক, অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকদের মতে, সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো কিশোর ও তরুণদের মাদকাসক্ত হয়ে পড়া। অভিযোগ রয়েছে, স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের একটি অংশও নেশাজাতীয় দ্রব্যের সংস্পর্শে চলে যাচ্ছে।

তাদের মতে, সহজ অর্থের প্রলোভন, বেকারত্ব, সামাজিক অবক্ষয় এবং অপরাধচক্রের প্রভাবে তরুণদের একটি অংশ মাদক ব্যবসা ও সেবনের দিকে ঝুঁকছে। এর ফলে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার বাড়ছে এবং সামাজিক অস্থিরতাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়মিত অভিযান ও গ্রেপ্তারের খবর পাওয়া গেলেও মাঠপর্যায়ে মাদকের প্রবাহ কমার কোনো দৃশ্যমান লক্ষণ নেই। খুচরা বিক্রেতারা গ্রেপ্তার হলেও বড় সিন্ডিকেটের সদস্য ও প্রভাবশালী পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা কম দেখা যায়। তাদের মতে, শুধু মাদকসেবী বা ছোটখাটো বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। মাদকের অর্থের জোগানদাতা, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রক এবং পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সচেতন মহলের দাবি, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত অভিযান, নিরপেক্ষ তদন্ত, জবাবদিহিমূলক আইন প্রয়োগ এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে মোহনপুরকে মাদকে।

দৈনিক বিজয় নিউজ / মোঃ রাজিব খাঁন