কৈশোরকালের পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
দৈনিক বিজয় নিউজ পাবিপ্রবি প্রতিনিধিঃ
সময়—সে তো এক অনন্ত নৌকা, বয়ে চলে স্মৃতির স্রোতে। কখনো তা নদীর কলকল শব্দে, কখনো ইতিহাসের কণ্ঠে ধ্বনিত হয় গৌরবের কাব্য। সেই স্রোতেরই দীপ্ত নাম—পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। আজ যার যাত্রা পেরিয়েছে গৌরবময় আঠারো বছর, পা রেখেছে উনিশতে—এক নতুন সম্ভাবনার প্রভাতে।
পাবনা-ঢাকা মহাসড়কের পাশঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা এই বিদ্যাপীঠ শুধু একটি শিক্ষাঙ্গন নয়—এ যেন জ্ঞানের দীপ্ত প্রতীক, স্বপ্নের রূপকার, সাহিত্যের ছায়াঘেরা বৃক্ষ, আর বিজ্ঞানের দীপ্তিতার অগ্নিশিখা। উত্তর বাংলার বুকজুড়ে এক আলোর মিনার হয়ে উঠেছে ‘পাবিপ্রবি’।
ইতিহাসের দিকে ফিরে দেখা
২০০১ সালের ১৫ জুলাই, প্রণীত হয় “পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০০১”—যেন এক নতুন সূর্যোদয়ের ঘোষণা। নগরবাড়ীর গয়েশপুর ধোপাঘাটার কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠে স্বপ্নের পাঠশালা। দীর্ঘ প্রতীক্ষা শেষে ২০০৮ সালের ১২ অক্টোবর যাত্রা শুরু হয় আনুষ্ঠানিকভাবে। ২০০৯ সালের ৫ জুন, বীর উত্তম এ কে খন্দকারের উদ্বোধনে শুরু হয় একাডেমিক যাত্রার পথ চলা। ২০১৩ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি ইউজিসি চেয়ারম্যান ড. এ কে আজাদ চৌধুরীর হাতে রাজাপুরে নিজস্ব ক্যাম্পাসে শুরু হয় পূর্ণতা পাওয়ার এক নতুন অধ্যায়।
আলোর পথে যাঁরা সহযাত্রী
এই বিদ্যাপীঠ আজ কেবল পাঠদান নয়, তৈরি করছে মননশীল, মানবিক ও সংস্কৃতিমনস্ক মানুষ। এখানে পাঠ্যসূচির গাঁথুনিতে মিশে আছে মূল্যবোধের বীজ, গবেষণার বুনন, সংস্কৃতির ছায়া। পাঁচটি অনুষদের অধীনে ২১টি বিভাগে জ্ঞান বিলিয়ে যাচ্ছেন প্রায় দুশত জন শিক্ষক-শিক্ষিকা, আর শিক্ষার দীপ্ত আগুনে পুড়ে স্বপ্ন গড়ছে প্রায় পাঁচ হাজার শিক্ষার্থী। ত্রিশ একরের সবুজে ঢাকা এই ক্যাম্পাস যেন এক বিস্তৃত জ্ঞান-দ্বীপ—শান্ত, স্নিগ্ধ, সম্ভাবনায় দীপ্ত।
স্থাপত্যে ইতিহাসের ছায়া
প্রধান ফটক পেরোলেই চোখে পড়ে সৌন্দর্যে মোড়া দেশীয় শিল্পকর্ম। ৫২ ফিট উঁচু শহীদ মিনার দাঁড়িয়ে আছে অবিচল, যেন ভাষা শহিদদের আত্মত্যাগের এক মূর্ত সাক্ষী। স্বাধীনতা চত্বর, স্মৃতিস্তম্ভ, নানান ভাস্কর্য—সব কিছুতেই যেন ইতিহাসের পদধ্বনি।
প্রাণে প্রাণ মেশানো ক্যাম্পাস
ক্লান্ত দুপুরের পরে প্রাণ ফেরায় খেলার মাঠ, যেখানে প্রতিদিন জমে ওঠে হর্ষধ্বনি আর আত্মবিশ্বাস। ‘কবি বন্দে আলী মিয়া মুক্তমঞ্চ’ যেন সাংস্কৃতিক সৃজনের অগ্নিগর্ভ কেন্দ্র—গান, কবিতা, নাটকে বেঁধে থাকে বাঙালির প্রাণ। ‘অনিরুদ্ধ নাট্যদল’, ‘কণ্ঠস্বর’, ব্যান্ড সংগঠন কিংবা বিভাগের স্পোর্টস ক্লাব—সবাই মিলেই সৃষ্টি করে প্রাণের উৎসব, সৃষ্টির নৃত্য।
প্রকৃতির কোলে স্বপ্নের উড়ান
শিউলি, কৃষ্ণচূড়া, পলাশের সৌরভে বিকেলের হাওয়ায় বেজে ওঠে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। আনন্দ সরোবরে জলের গর্জন আর পাখির কোলাহল যেন নিরব আশীর্বাদ। ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য রয়েছে বাস সেবা, দুটি আবাসিক হল এবং আরও দুটি নির্মাণাধীন। চিকিৎসা সেবায় জন্য রয়েছে মেডিকেল সেন্টার, আর জ্ঞানের সমুদ্র বিস্তার করে আছে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার—প্রায় চার হাজারের বেশি বইয়ের ভাণ্ডার নিয়ে।
সমাজে দীপ্ত পদচিহ্ন
পাঠ্যপুস্তকের গণ্ডির বাইরেও শিক্ষার্থীরা হয়ে উঠছে সমাজ সচেতন, মানবিক ও পরিবেশবান্ধব মানুষ। 'পাবিপ্রবির প্রেসক্লাব', ‘জোনাকি’, ‘হেল্প’, ‘গ্রিন ভয়েস’, ‘বিতর্ক ক্লাব’, ‘শুদ্ধচার মঞ্চ’—সবাই মিলেই গড়ে তুলছে সচেতনতার ভিত। এই বিদ্যাপীঠের ছাত্র-ছাত্রীরা কেবল শ্রোতা নয়, তারা প্রশ্ন করে, প্রতিবাদ করে, এগিয়ে আসে—অন্যায়ের বিরুদ্ধে, ন্যায়ের পক্ষে।
শেষ কথন
উনিশ বছরে পূর্ণতা নয়, বরং আরও পথচলার স্বপ্ন দেখে পাবিপ্রবি। প্রতিটি দেয়াল, প্রতিটি বৃক্ষ, প্রতিটি হৃদয়ে বয়ে চলে ইতিহাসের ধ্বনি। সময় পেরোবে, ব্যাচ পাল্টাবে, প্রজন্ম বদলাবে—কিন্তু পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই গৌরবগাঁথা থেকে যাবে চিরন্তন স্মারক হয়ে, ইতিহাসের পাতায় দীপ্ত স্বাক্ষর হয়ে।
দৈনিক বিজয় নিউজ/ ভাস্কর চন্দ্র রায়