হাইকোর্টের রায় উপেক্ষা: আলমডাঙ্গার ৪ ইউনিয়নে নাগরিক সেবা স্থবির, চরম ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ
দৈনিক বিজয় নিউজ বিশেষ প্রতিনিধিঃ
মহামান্য হাইকোর্টের স্পষ্ট নির্দেশনা এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পুনর্বহাল আদেশ থাকার পরও চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার ৪টি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) নির্বাচিত চেয়ারম্যানদের চেয়ারে বসতে দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার খাদিমপুর, ডাউকি, চিৎলা এবং খাসকররা ইউনিয়নে এই অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। প্রশাসনের এমন রহস্যজনক ভূমিকার কারণে ৪টি ইউনিয়নের লাখো নাগরিক চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন, সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, নাগরিক সনদ ও ওয়ারিশ সার্টিফিকেটের মতো জরুরি নাগরিক সেবা।নেপথ্যের ঘটনা:অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে নিজ নিজ কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগে একই বছরের ২৭ নভেম্বর জেলা প্রশাসকের এক আদেশে এই ৪টি ইউপি চেয়ারম্যানকে সাময়িকভাবে অপসারণ করে সেখানে সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ চেয়ারম্যানরা হাইকোর্টে পৃথক রিট পিটিশন দায়ের করেন। দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০২৬ সালের ১২ মার্চ মহামান্য হাইকোর্ট প্রশাসক নিয়োগের ওই আদেশের কার্যকারিতা ৬ মাসের জন্য স্থগিত করেন এবং নির্বাচিত চেয়ারম্যানদের স্বপদে বহাল রেখে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়ার নির্দেশ দেন।আদালতের নির্দেশের প্রেক্ষিতে পরবর্তীতে চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে পূর্বের প্রশাসক নিয়োগের প্রজ্ঞাপন বাতিল করে ডাউকি ইউপি চেয়ারম্যান তরিকুল ইসলাম, খাদিমপুর ইউপি চেয়ারম্যান মোজাহিদুর রহমান জোয়ার্দার লোটাস, চিৎলা ইউপি চেয়ারম্যান হাসানুজ্জামান সরোয়ার এবং খাসকররা ইউপি চেয়ারম্যান তাফসির আহমেদ মল্লিক লালকে পুনর্বহালের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।কেন বসতে দেওয়া হচ্ছে না?কাগজে-কলমে প্রশাসন পুনর্বহালের নির্দেশ জারি করলেও বাস্তবে চিত্র ভিন্ন। স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, বিগত রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা থাকায় এবং স্থানীয় কিছু মহলের রাজনৈতিক বিরোধিতার মুখে চেয়ারম্যানরা ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছেন না। অন্যদিকে, তৎকালীন নিযুক্ত প্রশাসকদের দায়িত্ব প্রত্যাহার করা হলেও নির্বাচিত চেয়ারম্যানদের পূর্ণ প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষমতা (ডিজিটাল আইডি ও পাসওয়ার্ড) বুঝিয়ে দিতে স্থানীয় প্রশাসন টালবাহানা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে এক অদ্ভুত শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে—পরিষদে না আছেন প্রশাসক, না বসতে পারছেন চেয়ারম্যান।ভোগান্তির চিলতে চিত্র:খাদিমপুর ও ডাউকি ইউনিয়নের একাধিক সেবাগ্রহীতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আমাদের সন্তানের স্কুলের উপবৃত্তির জন্য জন্ম নিবন্ধন দরকার, কিন্তু এক মাসেরও বেশি সময় ধরে পরিষদে কোনো কর্মকর্তা নেই, চেয়ারম্যানও নেই। কম্পিউটার অপারেটররা বলছেন ওপরের নির্দেশ ছাড়া তারা কোনো কাজ করতে পারবেন না। কোর্টের আদেশ থাকার পরও কেন সাধারণ মানুষকে এভাবে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে?"এর প্রতিকার কী?আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, মহামান্য হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ থাকার পর নির্বাচিত চেয়ারম্যানদের দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়া সরাসরি 'আদালত অবমাননা' (Contempt of Court)-র শামিল। এই সংকটের আশু প্রতিকারগুলো হলো:১. আইনি পদক্ষেপ: ভুক্তভোগী চেয়ারম্যানরা উচ্চ আদালতে স্থানীয় প্রশাসন (ডিসি ও ইউএনও)-র বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা করতে পারেন।২. প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ: স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে অনতিবিলম্বে জেলা প্রশাসনকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় চেয়ারম্যানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে চেয়ারে বসানোর কঠোর নির্দেশ জারি করতে হবে।৩. ডিজিটাল এক্সেস সচল করা: স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর বা সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে ইউপি সচিবদের মাধ্যমে অনলাইন নাগরিক সেবার আইডি-পাসওয়ার্ড সচল করে দিতে হবে।কর্তৃপক্ষের বক্তব্য:এই বিষয়ে আলমডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জানান, "আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। তবে স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক ও আইন-শৃঙ্খলাজনিত জটিলতার কারণে সাময়িক সমস্যা হচ্ছে। জনগণের নাগরিক সেবা যাতে ব্যাহত না হয়, সেজন্য দ্রুতই বিকল্প বা স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।"আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং চুয়াডাঙ্গার এই চার ইউনিয়নের লাখো মানুষের ভোগান্তি নিরসনে দ্রুততম সময়ে হাইকোর্টের রায়ের পূর্ণ বাস্তবায়ন দেখতে চান সচেতন মহল।
দৈনিক বিজয় নিউজ/ ইডি