নাইক্ষ্যংছড়ি বাইশারী ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র: সংকটের বেড়াজাল পেরিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যাশা!

নাইক্ষ্যংছড়ি বাইশারী ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র: সংকটের বেড়াজাল পেরিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যাশা!
ছবিঃ এম হাবিবুর রহমান রনি

দৈনিক বিজয় নিউজ নাইক্ষ্যংছড়ি (বান্দরবান) প্রতিনিধিঃ

বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার দুর্গম বাইশারী ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রটি দীর্ঘদিন ধরে তীব্র চিকিৎসক সংকট, প্রয়োজনীয় জনবল ঘাটতি এবং নাজুক অবকাঠামোগত সমস্যায় জর্জরিত ছিল। এর ফলে অত্র ইউনিয়নের প্রায় ৪০ হাজার গ্রামীণ মানুষ তাদের মৌলিক ও কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছিলেন। এই জনদুর্ভোগ ও অবহেলার চিত্র সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে—বিশেষ করে দৈনিক সাঙ্গু মাল্টিমিডিয়া, দৈনিক কালের সমাস এবং এটিভি সংবাদে—ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। সংবাদ প্রকাশের পর নড়েচড়ে বসে স্থানীয় প্রশাসন। স্বাস্থ্য কেন্দ্রটির বাস্তব অবস্থা স্বচক্ষে দেখতে তাৎক্ষণিকভাবে পরিদর্শনে যান নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সুযোগ্য উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (টিএইচও) ডা. আবু মনজুর। এ সময় তাঁর সঙ্গে আরও উপস্থিত ছিলেন অ্যাম্বুলেন্স চালক উছামং চাক, হিসাবরক্ষক আবুল কালামসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অন্যান্য কর্মকর্তারা।

পরিদর্শনকালে স্বাস্থ্য কেন্দ্রে উপস্থিত সাধারণ রোগী ও স্থানীয় এলাকাবাসী কর্তৃপক্ষের সামনে তাদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা এবং বিভিন্ন সংকটের চিত্র তুলে ধরেন। তারা অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে জানান, ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধার অভাবে তাদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। এ সময় তারা দ্রুত কিছু সুনির্দিষ্ট দাবি উপস্থাপন করেন, যার মধ্যে রয়েছে। টয়লেটগুলোকে দ্রুত ব্যবহারোপযোগী ও আধুনিক করা। হাত ধোয়ার জন্য পর্যাপ্ত বেসিন স্থাপন।নিরাপদ ও বিশুদ্ধ খাবার পানির সুব্যবস্থা নিশ্চিত করা সার্বিক স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থা গড়ে তোল।

এসব হাজারো সমস্যার মধ্যেও স্বাস্থ্য কেন্দ্রটিতে সম্প্রতি যোগদানের পর থেকে আশার আলো জ্বালিয়েছেন মিডওয়াইফ মোসাম্মৎ রাবেয়া বেগম। গত ৯ জুন ২০২৬ তারিখে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করে নিয়মিত প্রসূতি সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর নিবেদিতপ্রাণ সেবার ফলে ইতিমধ্যে তাঁর তত্ত্বাবধানে দুটি সফল স্বাভাবিক (নরমাল) প্রসব সম্পন্ন হয়েছে, যা স্থানীয় গর্ভবতী মায়েদের মাঝে ব্যাপক স্বস্তি ও ভরসা ফিরিয়ে এনেছে।

এ সময় অ্যাম্বুলেন্সের বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে চালক উছামং চাক জানান, ডেলিভারি বা জটিল রোগীদের উপজেলা সদরে রেফার করার ক্ষেত্রে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়ার নিয়ম অনুযায়ী প্রতি কিলোমিটারে ১০ টাকা করে দিতে হবে।

পরিস্থিতি সরেজমিন পর্যবেক্ষণের পর নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের টিএইচও ডা. আবু মনজুর আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন।স্বাস্থ্য কেন্দ্রে চিকিৎসাসেবা আরও গতিশীল ও উন্ন করতে আমরা অত্যন্ত আন্তরিক এবং প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ দ্রুত বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। রোগীদের জন্য বিশুদ্ধ খাবার পানির সুব্যবস্থা, টয়লেট ও বেসিন সংস্কার, স্বাস্থ্য কেন্দ্রের চারপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, চারপাশের জঙ্গল পরিষ্কার করা, দৃশ্যমান সাইনবোর্ড স্থাপন এবং ভবনের দেয়ালের ফাটলসহ অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামতের কাজ আজ কালকের মধ্যেই আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে।

তিনি আরও কঠোর নির্দেশনা দিয়ে বলেন, কর্মরত চিকিৎসক ডা. আরিফা আক্তার এবং মিডওয়াইফ রাবিয়া বেগমকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন প্রয়োজনীয় ওষুধ শেষ হওয়ার অন্তত ১০ দিন পূর্বে নতুন ওষুধের চাহিদাপত্র পাঠিয়ে পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করা হয়। এর ফলে কোনো অবস্থাতেই রোগীরা ওষুধ সংকটের শিকার হবেন না।

এলাকাবাসীর অন্তিম প্রত্যাশা, সংবাদ প্রকাশের পর স্বাস্থ্য বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এমন দ্রুত ও দায়িত্বশীল উদ্যোগ দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন বাইশারীর সাধারণ মানুষ। এলাকাবাসীর এখন একটাই প্রত্যাশা—প্রতিশ্রুত এই উদ্যোগগুলো যেন শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং দ্রুত বাস্তবায়িত হয়ে বাইশারী ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যার স্থায়ী সমাধান বয়ে আনে। এর মধ্য দিয়ে ইউনিয়নের হাজারো মানুষ খুব সহজেই তাদের দোরগোড়ায় মানসম্মত ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করতে পারবেন।

দৈনিক বিজয় নিউজ/ এম হাবিবুর রহমান রনি