রাজশাহী মোহনপুর গার্লস কলেজে নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন, অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে ঘুষের অভিযোগ
দৈনিক বিজয় নিউজ বিশেষ প্রতিনিধিঃ
রাজশাহীর মোহনপুর গার্লস ডিগ্রি কলেজের প্রয়াত প্রভাষক মো. সেলিম আহমেদের নিয়োগকে অবৈধ দাবি করেও প্রায় দুই দশক তাঁকে বেতন-ভাতা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে কলেজটির অধ্যক্ষ মো. আব্দুল মালেক মণ্ডলের বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে মৃত্যুর পর তাঁর অবসরকালীন পাওনা ও গ্র্যাচুইটির কাগজপত্র করে দেওয়ার বিনিময়ে স্ত্রী তামান্না ইয়াসমিনের কাছে পাঁচ লাখ টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগও রয়েছে। কলেজের গভর্নিং বডির সাবেক সভাপতির স্বাক্ষরিত সাময়িক বরখাস্তের আদেশ ও কারণ দর্শানোর নোটিশে এসব অভিযোগের উল্লেখ রয়েছে। নথিতে বলা হয়েছে, অধ্যক্ষ নিজেই একটি লিগ্যাল নোটিশের জবাবে সেলিম আহমেদের নিয়োগ বৈধ নয় বলে উল্লেখ করেন। একই জবাবে ২০০২ সালের ৮ ডিসেম্বর থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত তাঁকে বেতন দেওয়ার কথাও বলা হয়। এ ঘটনায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে—নিয়োগ অবৈধ হলে প্রায় ২০ বছর ধরে তিনি কীভাবে বেতন-ভাতা পেলেন এবং ২০০১ সালে কীভাবে এমপিওভুক্ত হলেন?
নিয়োগ ও এমপিওভুক্তি পরিবারের দাবি অনুযায়ী, ২০০০ সালের ৭ আগস্ট অনুষ্ঠিত নিয়োগ বোর্ডের সিদ্ধান্তে সেলিম আহমেদকে সমাজকল্যাণ বিষয়ের প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ৯ আগস্ট অধ্যক্ষ মো. আব্দুল মালেক মণ্ডলের স্বাক্ষরে নিয়োগপত্র দেওয়া হয় এবং ১২ আগস্ট তিনি চাকরিতে যোগদান করেন। পরবর্তীতে ২০০১ সালের ১ সেপ্টেম্বর তিনি এমপিওভুক্ত হন। তাঁর ইনডেক্স নম্বর ছিল ৮৩২২৪৫। সেলিম আহমেদের ভাই ও কেশরহাট পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর মাসুদ রানা অভিযোগ করেন, চাকরিতে নিয়োগের সময় অধ্যক্ষকে ৮০ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়েছিল। তবে এ অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। প্রায় দুই দশক চাকরির পর ২০২১ সালের ২৭ আগস্ট স্ট্রোকে আক্রান্ত হন সেলিম আহমেদ। ২৯ আগস্ট রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
‘নিয়োগ অবৈধ’ জবাবেই সেলিম আহমেদের স্ত্রী তামান্না ইয়াসমিনের অভিযোগ, স্বামীর মৃত্যুর পর গ্র্যাচুইটি ও অবসরকালীন পাওনা তুলতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের জন্য তিনি অধ্যক্ষের কাছে যান। কিন্তু দীর্ঘদিনেও কাগজপত্র প্রস্তুত করা হয়নি। তাঁর অভিযোগ, একপর্যায়ে অধ্যক্ষের কক্ষে গেলে কাগজপত্র ঠিক করে দেওয়ার বিনিময়ে পাঁচ লাখ টাকা দাবি করা হয়। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে পরে তাঁর স্বামীর নিয়োগ বৈধ নয় বলে জানানো হয়। এ বিষয়ে আইনজীবীর মাধ্যমে অধ্যক্ষের কাছে লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়। এর জবাবে কলেজের স্মারক নং—মোগাক/সা:/০২(৩)/২০২৪-এর চিঠিতে প্রয়াত সেলিম আহমেদের নিয়োগ বৈধ নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে বলে পরিবারটির দাবি। তবে নিয়োগ অবৈধ হয়ে থাকলে ২০০১ সালে এমপিওভুক্তির সময় তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আসেনি কেন এবং পরবর্তী প্রায় ২০ বছর বেতন-ভাতা কীভাবে দেওয়া হলো—এ প্রশ্নের উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়।
প্রায় ৮০ লাখ টাকা বেতনের দাবি গভর্নিং বডির সাময়িক বরখাস্তের আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে, সেলিম আহমেদকে দীর্ঘ সময় বেতন দেওয়া হয়েছে এবং প্রায় ২০ বছরে তাঁর পেছনে প্রায় ৮০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। বিষয়টিকে সরকারি অর্থের তছরুপের শামিল বলেও নথিতে উল্লেখ করা হয়। তবে ওই অর্থের সঠিক পরিমাণ, সরকারি অর্থের অংশ এবং বেতন প্রদানের পূর্ণাঙ্গ হিসাব নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নথি যাচাই প্রয়োজন। মৃত্যুর পরও কাগজপত্র নিষ্পত্তি হয়নি কারণ দর্শানোর নোটিশে বলা হয়েছে, সেলিম আহমেদের মৃত্যুর প্রায় দুই বছর পরও তাঁর অবসর-সংক্রান্ত কাগজপত্র সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়নি। অন্যদিকে তাঁর স্ত্রীকে ঘুষ দাবির অভিযোগও নোটিশে উঠে আসে। এসব অভিযোগের পর কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাব না দেওয়ার অভিযোগে ২০২৪ সালের ২১ মার্চ কলেজের গভর্নিং বডি অধ্যক্ষ মো. আব্দুল মালেক মণ্ডলকে সাময়িক বরখাস্ত করে। বরখাস্তের আদেশে নৈতিক শৃঙ্খলাভঙ্গ, গভর্নিং বডির নির্দেশনা উপেক্ষা, ঘুষ ও দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়।
পরিবারে আর্থিক চাপ পরিবারের ভাষ্য, মৃত্যুর সময় সেলিম আহমেদের সর্বশেষ বেতন-স্কেল ছিল প্রায় ৪৪ হাজার টাকা। তিনি স্ত্রী ও দুই মেয়ে রেখে গেছেন। বড় মেয়ে বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিষয়ে পড়ছেন এবং ছোট মেয়ে মোহনপুর গার্লস ডিগ্রি কলেজের এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। পরিবারের দাবি, সোনালী ব্যাংকে তাঁর প্রায় আট লাখ টাকার কনজুমার লোন ছিল। সুদসহ ওই ঋণের দায় বেড়ে যাওয়ায় পরিবারের আর্থিক চাপ আরও বাড়ছে। তদন্তের দাবি সেলিম আহমেদের নিয়োগ নিয়ে প্রকৃত তথ্য জানতে ২০০০ সালের নিয়োগ বোর্ডের কার্যবিবরণী, নিয়োগপত্র, যোগদানপত্র, এমপিওভুক্তির নথি, ইনডেক্স সংক্রান্ত কাগজপত্র এবং দীর্ঘ সময়ে বেতন-ভাতা প্রদানের হিসাব যাচাইয়ের দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে ২০০১ সালে এমপিওভুক্তির সময় নিয়োগের বৈধতা কীভাবে যাচাই করা হয়েছিল এবং ২০২৪ সালে এসে কেন সেই নিয়োগকে অবৈধ বলা হলো—তা তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট করার দাবি রয়েছে।
পাশাপাশি পাঁচ লাখ টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগেরও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং অভিযোগের সত্যতা না থাকলে সেটিও পরিষ্কার হওয়া জরুরি। কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অভিযোগের বিষয়ে কলেজের অধ্যক্ষ মো. আব্দুল মালেক মণ্ডলের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। কলেজের বিদ্যোৎসাহী সদস্য মাহবুব আর রশিদ বলেন, বিষয়টি তাঁর জানা নেই। অভিযোগ থাকলে তা যাচাই করে সমাধানের চেষ্টা করা হবে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত কলেজ পরিদর্শক নাজিম উদ্দীন আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁর পক্ষে ওবাইদুর নামে একজন জানান, তিনি মিটিংয়ে ব্যস্ত রয়েছেন। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, রাজশাহীর চেয়ারম্যান (প্রেষণে) প্রফেসর ড. শামীম আরা চৌধুরী বলেন, অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা, রাজশাহী অঞ্চলের পরিচালক প্রফেসর মো. হুমায়ূন কবীর বলেন, তিনি নতুন দায়িত্বে এসেছেন এবং বিষয়টি তাঁর জানা নেই।
দৈনিক বিজয় নিউজ / মোঃ রাজিব খাঁন