মোহনপুর উপজেলা হলরুমের সামনে পড়ে আছে ইতিহাসের সাক্ষী সেই টেলিফোন
দৈনিক বিজয় নিউজ বিশেষ প্রতিনিধিঃ
একসময় যোগাযোগের ভরসা, এখন পড়ে আছে অবহেলায়—মুঠোফোনের যুগে হারিয়ে যাচ্ছে টেলিফোনের স্মৃতি। রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলা হলরুমের সামনে নীরবে পড়ে আছে একটি পুরোনো টেলিফোন। একসময় যে যন্ত্রের মাধ্যমে দূরের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা হতো, অফিসের গুরুত্বপূর্ণ খবর আদান-প্রদান করা হতো—আজ সেই টেলিফোনই যেন সময়ের পরিবর্তনের সাক্ষী হয়ে পড়ে আছে পরিত্যক্ত অবস্থায়। দেখলে মনে হয়, টেলিফোনটি এখনো যেন কারও ফোনের অপেক্ষায় আছে। তার পুরোনো রিসিভারটি যেন স্মরণ করিয়ে দেয় সেই সময়ের কথা—যখন একটি টেলিফোন সংযোগ পাওয়া ছিল অনেকের কাছে বড় ব্যাপার, আর সরকারি অফিসে জরুরি যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল ল্যান্ডফোন। মোহনপুর উপজেলা প্রশাসনের পুরোনো যোগাযোগব্যবস্থার সঙ্গে এই ধরনের টেলিফোনের স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে বলে স্থানীয়দের ধারণা। বর্তমানে মুঠোফোন, স্মার্টফোন, ইন্টারনেট ও বিভিন্ন অনলাইন যোগাযোগব্যবস্থা মানুষের হাতের মুঠোয় চলে আসায় সেই ল্যান্ডফোনের প্রয়োজনীয়তা অনেকটাই কমে গেছে।
টেলিফোন থেকে মুঠোফোন—বদলে গেছে পুরো যোগাযোগব্যবস্থা বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগের ইতিহাস দীর্ঘ। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ১৮৫৩ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতে পোস্ট ও টেলিগ্রাফ বিভাগের মাধ্যমে এ খাতের প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ টেলিগ্রাফ ও টেলিফোন বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালে টেলিগ্রাফ ও টেলিফোন বোর্ড এবং ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ টেলিগ্রাফ অ্যান্ড টেলিফোন বোর্ড—বিটিটিবি নামে সরকারি কাঠামো গড়ে ওঠে। ২০০৮ সালের ১ জুলাই বিটিটিবি রূপান্তরিত হয়ে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন্স কোম্পানি লিমিটেড—বিটিসিএল নামে যাত্রা শুরু করে। একসময় সরকারি অফিস, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং সীমিতসংখ্যক পরিবারের কাছে টেলিফোন ছিল যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। বিটিআরসির তথ্যেও বলা হয়েছে, একসময় টেলিফোনের ব্যবহার মূলত সরকারি অফিস-আদালত, বড় শহর ও নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল; পরবর্তীতে মোবাইল প্রযুক্তির বিকাশে টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা দ্রুত বদলে যায়।
মোহনপুরেও রয়েছে টেলিফোন এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন্স কোম্পানি লিমিটেডের রাজশাহী কার্যালয়ের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মোহনপুর টেলিফোন এক্সচেঞ্জের ধারণক্ষমতা ১২৮ লাইন। অর্থাৎ আধুনিক মোবাইল যোগাযোগের যুগেও ঐতিহ্যবাহী টেলিফোন অবকাঠামোর অস্তিত্ব পুরোপুরি বিলীন হয়নি। তবে বাস্তবতা হলো—একসময় যে ল্যান্ডফোন ছিল যোগাযোগের অন্যতম প্রধান ভরসা, এখন তার জায়গা নিয়েছে মুঠোফোন। স্মার্টফোনের মাধ্যমে মুহূর্তেই কথা বলা, ভিডিও কল, ছবি পাঠানো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যোগাযোগ কিংবা ইন্টারনেটভিত্তিক নানা সেবা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে। শুধু একটি পুরোনো যন্ত্র নয়, এটি একটি সময়ের স্মৃতি মোহনপুর উপজেলা হলরুমের সামনে পড়ে থাকা এই টেলিফোনটি তাই কেবল একটি পরিত্যক্ত যন্ত্র হিসেবে দেখলে হয়তো এর গুরুত্ব বোঝা যাবে না। এটি একটি পরিবর্তনের প্রতীক—পুরোনো তারযুক্ত টেলিফোন থেকে আজকের ওয়্যারলেস স্মার্টফোনে পৌঁছানোর দীর্ঘ যাত্রার নীরব সাক্ষী। একসময় এই টেলিফোনের রিং শুনলেই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে তৈরি হতো ব্যস্ততা। দূরের কোনো অফিস থেকে খবর এসেছে, কোনো জরুরি নির্দেশনা এসেছে কিংবা কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলতে হবে—সবকিছুর জন্য নির্ভর করতে হতো সেই ল্যান্ডফোনের ওপর।
আজ সেই ফোনের প্রয়োজন নেই। চারপাশে স্মার্টফোনের ছড়াছড়ি। হাতে হাতে অ্যান্ড্রয়েড ফোন, ইন্টারনেট আর তাৎক্ষণিক যোগাযোগের সুবিধা। তবুও পুরোনো সেই টেলিফোনটি যেন নীরবে বলে যায়—প্রযুক্তি বদলায়, যোগাযোগের মাধ্যম বদলায়, কিন্তু ইতিহাসের স্মৃতি হারিয়ে যায় না। স্থানীয়দের দাবি, মোহনপুর উপজেলা হলরুমের সামনে পড়ে থাকা ঐতিহাসিক টেলিফোনটি যদি সংরক্ষণ করে একটি ছোট স্মারক বা প্রদর্শনী স্থানে রাখা হয়, তাহলে নতুন প্রজন্ম জানতে পারবে—আজকের মুঠোফোনের যুগে পৌঁছানোর আগে যোগাযোগব্যবস্থা কতটা দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছে। পরিত্যক্ত নয়—স্মৃতি হিসেবে সংরক্ষণ করা হোক সেই পুরোনো টেলিফোন।
দৈনিক বিজয় নিউজ / মোঃ রাজিব খাঁন