ফ্রান্সজুড়ে সহিংস বিক্ষোভ, পরিস্থিতি যেন যুদ্ধের ময়দান

ফ্রান্সজুড়ে সহিংস বিক্ষোভ, পরিস্থিতি যেন যুদ্ধের ময়দান
ছবিঃসাব্বির

দৈনিক বিজয় নিউজ  বিশেষ প্রতিনিধি:

ফ্রান্সজুড়ে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিস্থিতি নিয়ে শনিবারের বিক্ষোভ সহিংস রূপ নেওয়ায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। দেশটির বিভিন্ন শহরে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় প্রায় ১ হাজার ৮০০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় দেড় হাজার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। এসব ঘটনায় আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ কয়েক শ মিলিয়ন ইউরো হতে পারে বলে জানিয়েছে দেশটির খুচরা বিক্রেতা ও বাণিজ্য ফেডারেশন।রোববারও রাজধানী প্যারিসসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভের ক্ষতচিহ্ন দেখা গেছে। কোথাও পোড়া গাড়ি, কোথাও ভাঙা দোকানের কাচ, আবার কোথাও সড়কে পড়ে ছিল পুড়ে যাওয়া ব্যারিকেড ও ধ্বংসাবশেষ।

পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে প্যারিসের ৭৮ বছর বয়সী বাসিন্দা মেহমেত ওজেদেন বলেন, ‘মনে হচ্ছিল, যেন আমরা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে গেছি।’এই সহিংসতা ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর সরকারের ওপর নতুন চাপ তৈরি করেছে। ছয় মাস পর নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রস্তুতির মধ্যে তাঁর ক্ষমতার শেষ সময়টিতে এমন পরিস্থিতি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এর আগে কয়েক সপ্তাহ ধরে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন আন্দোলনেও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছিল।

প্যারিসে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ জানিয়েছেন, বিক্ষোভ ও লুটপাটের ঘটনায় সারা দেশে প্রায় ১ হাজার ৮০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনতে তদন্ত চলছে বলেও জানান তিনি।কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, রাজধানী প্যারিসে গ্রেপ্তারের সংখ্যা রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। সেখানে ৫৫৭ জনকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। শহরের বিভিন্ন সড়কে পোড়া গাড়ি, ভাঙচুর করা দোকান এবং অগ্নিসংযোগের চিহ্ন দেখা গেছে।

প্যারিসের ডেপুটি মেয়র লামিয়া এল আরাজে বলেন, রাজধানীতে এমন মাত্রার সহিংসতা আগে কখনো দেখা গেছে বলে তাঁর মনে পড়ে না।জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে আয়োজিত বিক্ষোভের সময় প্যারিস ছাড়াও মার্সেই, বোর্দো, নিস ও স্ত্রাসবুর্গসহ বিভিন্ন শহরে শত শত দোকানে লুটপাটের ঘটনা ঘটে।প্যারিসের মূল মিছিলে একজনের মৃত্যু হয়েছে। তবে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাঁর মৃত্যু স্বাস্থ্যগত কারণে হয়েছে; বিক্ষোভের সহিংসতার সঙ্গে এর সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।খুচরা বিক্রেতা ও বাণিজ্য ফেডারেশনের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ১ হাজার ৫০০ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে কয়েক শ মিলিয়ন ইউরোর আর্থিক ক্ষতি হতে পারে।

প্যারিসের বাসিন্দা আনিতা গ্রাস ধ্বংসাবশেষের পাশ দিয়ে দৌড়ানোর সময় একটি ক্রীড়াসামগ্রীর দোকানে তরুণদের লুটপাট করতে দেখেছেন বলে জানান। তাঁর ভাষ্য, রাত একটা পর্যন্ত তারা সেখানে ছিল। তাদের ভয়ে আশপাশের মানুষ আতঙ্কে ছিলেন।৫৭ বছর বয়সী আরেক বাসিন্দা সেসিল রোগ বলেন, শনিবার একদল তরুণ এলাকায় এসে লুটপাট ও ভাঙচুর চালায়। পরিস্থিতি দেখে তিনি আতঙ্কিত ও ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েন।

আগুনে পুড়ল ঐতিহাসিক টাউন হল

ফ্রান্সের লিমোজ শহরে অগ্নিকাণ্ডে উনিশ শতকে নির্মিত ঐতিহাসিক টাউন হলটি পুড়ে গেছে। স্থানীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তা মরিস বারাত দেশটির সংবাদমাধ্যম এলসিআইকে জানান, একটি উচ্ছৃঙ্খল দল ইচ্ছাকৃতভাবে ভবনটিতে আগুন দিয়েছে। রোববার ভোরের দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়।লিওঁ শহরেও সহিংসতা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। শহরের মেয়র গ্রেগরি দুসে বলেন, কয়েক ঘণ্টা ধরে শহরে যে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি চলেছে, তা ছিল ভয়াবহ। বিক্ষোভের সময় শহরের কেন্দ্রস্থলে একটি পর্যটন তথ্যকেন্দ্রেও আগুন দেওয়া হয়।

ঘটনাগুলোর পর দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনেও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ শুরু হয়েছে। সরকার ও ডানপন্থী নেতা মেরিন লে পেনের পক্ষ থেকে চরম বামপন্থী গোষ্ঠীগুলোকে সহিংসতার জন্য দায়ী করা হয়েছে। অন্যদিকে বামপন্থী নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁর অভিযোগ, কর্তৃপক্ষের ভূমিকা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করেছে।প্যারিসের সমাজতান্ত্রিক দলের ডেপুটি মেয়র এল আরাজে অভিযোগ করেন, লে পেনের দল বিক্ষোভকে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করছে। তাঁর ভাষায়, দলটি আগুন নেভানোর ভান করে পরিস্থিতিকে আরও উসকে দেওয়া অগ্নিনির্বাপকের মতো আচরণ করছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও এ ঘটনায় মন্তব্য করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া বক্তব্যে তিনি ফ্রান্সে অস্থিরতার পেছনে ‘তৃতীয় বিশ্বের’ মানুষকে নিয়ে আসার বিষয়টি ইঙ্গিত করে মন্তব্য করেন।সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিমা সহায়তা ও সরকারি সহযোগিতা এবং অভিযুক্তদের বিচারের বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু সোমবার সকাল ৮টা GMT-তে মন্ত্রিসভার একটি জরুরি বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন বলে তাঁর দপ্তর জানিয়েছে।

পাঁচ লাখের বেশি মানুষের বিক্ষোভ

শনিবারের বিক্ষোভে অংশ নেওয়া মানুষের সংখ্যা নিয়েও ভিন্ন তথ্য দিয়েছে কর্তৃপক্ষ ও আয়োজকেরা। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, দেশজুড়ে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। তবে শ্রমিক সংগঠন সিজেটি (CGT) জানিয়েছে, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৮ লাখ।প্যারিসের বিভিন্ন সড়কে কাঁদানে গ্যাস ও বিক্ষোভকারীদের ভিড়ের মধ্যে পর্যটকদের স্যুটকেস নিয়ে ছুটতে দেখা যায়। ডেনমার্কের পর্যটক সোরেন পিটারসেন শহরের ভবনগুলোর ক্ষয়ক্ষতি দেখে দুঃখ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, এটি আর স্বাভাবিক কোনো প্রতিবাদ ছিল না; পরিস্থিতি স্বাভাবিক বিক্ষোভের সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের পর্যটক জিল বার্নসও জানান, পরিস্থিতি তাঁদের আতঙ্কিত করে তুলেছিল।স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সহিংসতার ঘটনায় প্রায় ৫০০ পুলিশ সদস্য, অগ্নিনির্বাপণকর্মী ও জরুরি চিকিৎসাসেবাকর্মী আহত হয়েছেন। দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর সাঁত এতিয়েনে জনতা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত একটি গ্রেনেডের বিস্ফোরণে ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরের ডান হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, বিক্ষোভের সব অংশই সহিংস ছিল না। ইউরেশিয়া গ্রুপের বিশ্লেষক মুজতবা রহমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া মন্তব্যে বলেন, শনিবারের অধিকাংশ বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ ছিল। তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চরম বামপন্থী একটি ক্ষুদ্র অংশের কাছ থেকে সহিংসতা ছড়ায় এবং দরিদ্র উপশহরগুলো থেকে আসা কিছু সুযোগসন্ধানী দল লুটপাটে অংশ নেয়।

তিনি মন্তব্য করেন, এ পরিস্থিতি মেরিন লে পেনের রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।উল্লেখ্য, আট বছর আগে জ্বালানি কর বৃদ্ধির পরিকল্পনার প্রতিবাদে ফ্রান্সে প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ সরকারের বিরুদ্ধে ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। সেই আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা শনিবারের ‘ইয়েলো অ্যান্ড ইয়ুথ’ নামে পরিচিত বিক্ষোভের ডাক দিয়েছিলেন। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও শিক্ষাব্যবস্থার পরিস্থিতি নিয়ে শুরু হওয়া এই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত দেশটির বিভিন্ন শহরে ব্যাপক সহিংসতা ও ক্ষয়ক্ষতির জন্ম দেয়।

দৈনিক বিজয় নিউজ/ সাব্বির