পাবনার সাদুল্লাপুর-চরতারাপুর কোল সংস্কার : পরিকল্পিত উন্নয়নে কৃষি, মৎস্য, পরিবেশ, পর্যটন ও কর্মসংস্থানের অপার সম্ভাবনা

পাবনার সাদুল্লাপুর-চরতারাপুর কোল সংস্কার : পরিকল্পিত উন্নয়নে কৃষি, মৎস্য, পরিবেশ, পর্যটন ও কর্মসংস্থানের অপার সম্ভাবনা
ছবিঃ এম এ খালেক

দৈনিক বিজয় নিউজ প্রতিনিধি:

পাবনা জেলা শহর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার পূর্বে পাবনা-সুজানগর মহাসড়ক সংলগ্ন সাদুল্লাপুর-চরতারাপুর কোল দীর্ঘদিন ধরে এলাকার কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ জলাশয় হিসেবে পরিচিত। এ কোলের পশ্চিমে দুবলিয়া হাজী জসিম উদ্দিন ডিগ্রি কলেজ, পূর্বে কাঁচিপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়, উত্তরে সাদুল্লাপুর উচ্চ বিদ্যালয় এবং দক্ষিণে মুজিববাঁধ সংলগ্ন রাস্তা পর্যন্ত বিস্তৃত। এই বিশাল কোলটি যথাযথ পরিকল্পনার মাধ্যমে সংস্কার ও আধুনিক ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা গেলে এটি শুধু একটি জলাশয় নয়, বরং দক্ষিণ-পূর্ব পাবনার অন্যতম অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সম্পদে পরিণত হতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। বর্তমানে কোলটির একটি বৃহত অংশ লীজের আওতায় থাকার কারণে এলাকার সাধারণ মানুষের অবাধ প্রবেশ ও ঐতিহ্যবাহী মাছ ধরার সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েছে। ফলে দরিদ্র মৎস্যজীবী, কৃষক, সাধারণ জনগণ ও উপকারভোগীরা দীর্ঘদিন এ কোলের সেবা থেকে বঞ্চিত রয়েছে। এতে স্থানীয় জনসাধারণের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। স্থানীয়দের দাবি, একটি স্বচ্ছ ও জনবান্ধব নীতিমালার মাধ্যমে কোলটি সংস্কার করে জনগণের কল্যাণে ব্যবহার নিশ্চিত করা দরকার। অনেকের মতে, কোলটি পুনঃখনন ও সংস্কার করা হলে সারা বছর পর্যাপ্ত পানি সংরক্ষণ সম্ভব হবে। এতে কোলের আশ পাশের কয়েকশ একর কৃষিজমিতে সহজ ও স্বল্প ব্যয়ে পানি সেচ দেওয়া যাবে। এতে ধান, সবজি, ভুট্টা, সরিষাসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং কৃষকদের উৎপাদন ব্যয়ও কমে যাবে।


পরিকল্পিত ভাবে এ কোলের নানা সংস্কার করে বিশেষ করে গভীরতা বৃদ্ধি, পানি ব্যবস্থাপনা ও আধুনিক মৎস্যচাষ চালু করা গেলে দেশীয় মাছের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে পারে। একই সঙ্গে প্রকৃত মৎস্যজীবীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে সমবায় ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা চালু করলে স্থানীয় মানুষের আয় বাড়বে এবং সরকারের রাজস্বও বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা যায়।এলাকাবাসী ও স্থানীয়রা জানান, একটি নীতিমালা অনুযায়ী কোলের চারপাশে হাঁটার পথ, বসার ব্যবস্থা, শিশু পার্ক, বিনোদন কেন্দ্র, নৌবিহার, নানান খাবারের দোকান ও উন্মুক্ত বিনোদন কেন্দ্র নির্মাণ করা গেলে এটি পাবনা সদর ও সুজানগর এলাকার মানুষের অন্যতম অবকাশ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। এছাড়াও এ কোলে শিক্ষার্থী, পরিবার, পরিজন ও পর্যটকদের আগমন বাড়লে স্থানীয়দের নানান ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্যও সম্প্রসারিত হবে। এই কোলের চারপাশে হাজার হাজার ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছ রোপণ করা গেলে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, পাখির আবাসস্থল সৃষ্টি ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এসব বৃক্ষ স্থানীয় জনগণেরও উপকারে আসবে। মৎস্যচাষ, পর্যটন, নৌবিহার, ক্ষুদ্র ব্যবসা, নার্সারি, কৃষিভিত্তিক কার্যক্রম ও বিভিন্ন সেবাখাত মিলিয়ে শত শত মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে বলে এলাকাবাসী জানান। বিশেষ করে এলাকার বেকার যুবক যুবতীদের জন্য এটি একটি নতুন সম্ভাবনার ক্ষেত্র হয়ে উঠবে। এলাকার সকল পেশার মানুষ ও স্থানীয় অধিবাসীরা জানান, একসময় শুষ্ক মৌসুমে এই কোলে পোলো দিয়ে গ্রামবাসী ও বাউতদের মাছ ধরা ছিল একটি গ্রামীণ উৎসব। কোলটি লীজ ব্যবস্থার কারণে সেই ঐতিহ্য প্রায় বিলুপ্ত হয়েছে। এলাকাবাসীর আশা, নির্দিষ্ট সময়ের জন্য এ কোলে সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত মাছ ধরার সুযোগ রেখে ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করা হোক। স্থানীয় জনসাধারন জানান, বর্তমান সরকারের খাল,খনন ও জলাশয় পুনঃখনন কর্মসূচির আওতায় সাদুল্লাপুর-চরতারাপুরের এ বৃহৎ কোলকে অন্তর্ভুক্ত করা হলে কৃষি, মৎস্য, পরিবেশ ও পর্যটনসহ সকল ক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। একই সাথে স্বচ্ছ ও বিশেষ নীতিমালার মাধ্যমে প্রকৃত মৎস্যজীবী ও স্থানীয় কৃষকদের অধিকার নিশ্চিত করে জলাশয়টি জনকল্যাণে ব্যবহার করা সম্ভব হবে। সচেতন মহল জানান, সঠিক পরিকল্পনা, পরিবেশ বান্ধব উন্নয়ন ও অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে সাদুল্লাপুর-চরতারাপুর কোলকে একটি বহুমুখী জলসম্পদে রূপান্তর করা গেলে এটি শুধু সাদুল্লাপুর ও চরতারাপুর ইউনিয়নের মানুষের জন্য নয়, সমগ্র পাবনা অঞ্চলের উন্নয়ন ও বিনোদনের জন্য এ কোলটি মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। পাবনা জেলা ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি মোঃ বাবুল আক্তার বিশ্বাস বাবু ও এলাকাবাসী বিষয়টির প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য পাবনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য এডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন।

দৈনিক বিজয় নিউজ/ এম এ খালেক খান