ঠিকানা - " ভাবীর মোড়! " এ বাজারের নাম বদলে গেছে ৪ জন ভাবীর জন্য ৷ কি এমন আছে দিনাজপুরের বোঁচাগঞ্জের এই ছোট্ট মফস্বলটিতে ?

ঠিকানা -
ছবিঃ মোঃ আতিউর রহমান

দৈনিক বিজয় নিউজ দিনাজপুর প্রতিনিধিঃ

৩৩ বছর আগের কথা। টাঙ্গন নদের ধারে রাণীর ঘাট মোড়৷ চর পড়লে নদীতে বালু তুলতে আসতো শ্রমিকেরা। আশপাশে খাবারের দোকান নেই৷ পাশের গ্রামেরই দরিদ্র নারী মাসতারা বেগমের তখন সবে বিয়ে হয়েছে, সবজি বিক্রেতা স্বামীর দু-বেলা খাবারেরও জো নেই ৷ বছর পনেরোর কিশোরী বউটি বুদ্ধি করে চা-বিস্কুট বেচা শুরু করলো শ্রমিকদের কাছে৷ একদিন শ্রমিকেরাই বলে বসল,"ভাবি, ভাত খাওয়ান!" ডাল-ভাত দিয়ে শুরু করলেন মাসতারা৷ শ্রমিকরা চায় মাংস। কিশোরী মাসতারা মাংস বলতে চেনেন শুধু হাঁস,তাও আবছা। হাঁসের মাংস দিয়েই তিনি শুরু করলেন এ মোড়ে এক অনাড়ম্বর ভাতের হোটেল৷ দাম বড়ো অল্প, অথচ পরিমাণে অনেক বেশি, সাথে আছে নানা পদের আঞ্চলিক খাবার, ভর্তা-ভাজি-সালাদ। মাসতারার হাত ধরলেন আরোও তিন গৃহবধূ। সংসারের দেনা মেটাতে তারাও দিলেন তিনখানা হোটেল৷ দূর দূরান্তে ছড়িয়ে গেলো, ভাবীদের হোটেলের হাঁসের মাংসের কথা৷ কালে কালে রাণীর ঘাটকে ভুলেই গেলো সবাই৷ নাম পড়ল 'ভাবীর মোড়'।

এখন এ নামেই চেনে গোটা দেশ, ফিচার হয় পত্র-পত্রিকায়। মাসতারার বয়স এখন ৪৫৷ জীবনে কেনোদিন দিনাজপুর জেলা শহরেও যাননি তিনি৷ বাপের বাড়ি রাজশাহী যেতে ট্রেনে চড়তে হয়, ভয় পান বলে শুয়ে অথবা চোখ বেঁধে যান তিনি৷ নিজ হাতে রাঁধেন, সামলান ভাবীর হোটেল, টানা থাকে এক লম্বা ঘোমটা৷ এতো সংকীর্ণ গন্ডি যে নারীর, তাকে কিন্তু চেনে গোটা দেশ! ঢাকা দেখেছেন জীবনে? মাসতারা বলেন, "আমাক যেইভাবে আনে থুইছে (স্বামী), সেইভাবেই আছি৷ দিনাজপুরোতে যাই নাই জীবনে আর ঢাকা! " শহরের বড়ো বড়ো রেস্তোরাঁয় হয়তো নামী দামী শেফ পাবেন, ভাবীর মোড় নিয়ে অভিযোগও হয়তো শোনা যায় অল্প বিস্তর। কিন্তু এই যে গ্রাম্য নারীদের জীবনযুদ্ধ, যুদ্ধজয়, একেও কি অস্বীকার করা যায়? অনেকে বলেন দিনাজপুরে আইকনের বড়ো অভাব৷ আমরা বলি, এই অশিক্ষিত গেঁয়ো অথচ জীবনসংগ্রামী ভাবীদের মতো মানুষরাই আমাদের দিনাজপুরের, এমনকি দেশের সবচেয়ে বড়ো আইকন..প্রেরণার ঠিকানা একেকটি ভাবীর মোড়..

দৈনিক বিজয় নিউজ/ মোঃ আতিউর রহমান