বাংলাদেশের বাংলা ভাষা চেতনায় চালিত সংগ্রামে বাংলা ব্লকেড কমপ্লিট শাটডাউন (লেখক - অধ্যাপিকা ড.হোসনে আরা বেগম )
দৈনিক বিজয় নিউজ প্রতিনিধিঃ
আমি বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী ছিলাম, বাংলা ভাষায় মোটেই কোনো দখল নাই। লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশ ৫৩ বছর অতিক্রম করছে। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সদ্য মেট্রিক পাশ করে কলেজে অধ্যয়ন করার মধুর স্বপ্ন, সংসারের সমস্যা এবং দারিদ্রতার দাবানল থেকে দূরে থাকার জন্য কলেজে যাওয়াটা ছিল আমার কাছে বড় বিনোদন। স্বাধীনতা যুদ্ধ চলছিল, কলেজে যেতে পারছি না। কোথায় যাবো, কি করবো, কিছু একটা করতে হবে, কোথাও যেতে হবে; এজন্য ছোটাছুটি করছিলাম। আমার থেকে কয়েক বছরের বয়সে বড় হলেও একই নাম হেতু তেলিহারার আমার মায়ের শিক্ষক বছির মুন্সি সাহেবের ছোট ছেলে, শিল্পপতি শামসুল সাহেবের ছোট ভাই সামাদ ওরফে কালে সামাদ এর আমাদের বাড়িতে যথেষ্ট আসা-যাওয়া ছিল। আমাকে মিতা মিতা বলে অনেক স্নেহ করতো, আদর-আপ্যায়ন করতো। সে আমাকে বলল, মিতা খাওয়া-দাওয়া ও সমাদরের কোনো অভাব নাই, চলো বালুরঘাটের ক্যাম্পে যাই। তোমার শারীরিক অসুস্থতার জন্য প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে না পারো, তোমার সুবিধামতো সহায়তা করবে, তোমার অনেক ভালো লাগবে। “একেতো নাচুনে বুড়ি, তার উপর ঢোলকের বাড়ি” আর যায় কোথায়। সাথে সাথে রাজি হলাম। হিলির বর্ডার পেরিয়ে ভারতে গেলাম। ক্যাম্পে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কলেজের অতিপরিচিত মুখ সবুর ভাই আমাকে বললেন, “এই তুইও আসছিস এই শরীর নিয়ে”। মোফাজ্জল ভাই বললেন, “ভালো করেছে, ভালো করেছে, আমি সামাদকে (বর্তমান হোসনে-আরা) দেখাশোনা করবো”। উত্তরবঙ্গের বড় নেতা জলিল ভাই, পটল ভাই, খসরু ভাই, ফারুক ভাই সবাই আমাকে দেখে খুশি হলেন। ঐ ক্যাম্পের খানাপিনা মোটামুটি চলনসই ছিল। প্রসাব-পায়খানা, গোসল ইত্যাদি প্রতিকূলতা বিশেষ করে আমার শারীরিক অসুবিধা জনিত কারণে প্রত্যহ শেষ রাতে জনশূন্যতার সুযোগে গোসল করতাম। গোসল আমার নিকট বড়ই ভীতিকর ছিল। এখন পর্যন্ত এই গোসল বিষয়ে ফোবিয়া বহন করছি। গোসল ফোবিয়া দূর করার জন্য মনকে সাহস দিতে হয়, আমার নিয়ন্ত্রিত বাথরুমেই তো গোসল করছি। মনে শঙ্কা কেন। ঐ সময় ক্যাম্পে সামাদ ভাইকে বললাম, আমার মায়ের মাথা ব্যাথা বেরাম মাসে কমপক্ষে দুই বার ওঠে। এবার নাকি বন্ধ হচ্ছে না। আমাদের গ্রামের ইসরাইল সাহেব বললেন, এই মুহুর্তেই তোমার চলে যাওয়া উচিত। মোফাজ্জল ভাই আমাকে সঙ্গে নিয়ে হিলির বর্ডার পেরিয়ে এপার এসে এমদাদ আলী চৌধুরীর সাক্ষাৎ মিলল, তিনিসহ আমরা তিনজন গ্রামে আসলাম। আমার বড়ভাই আব্দুর রহমান বগুড়া মোস্তফাবিয়া টাইটেল মাদ্রাসার ছাত্র, আমার মাথার উপরে হাত দিয়ে আমাকে চেপে ধরে বললেন, তুই আর কয়েকদিন না আসলে মা মারা যেত। বাড়ি ছেড়ে কখনোই কোথাও যাবি না। আমার বড়আব্বা, জেঠাতো ভাইয়েরা বলল, এই লটখটে সামাদকে বেঁধে রাখতে হবে, এই সামাদ ছাদোমাটেল যেন কোথাও যেতে না পারে। আমি কিরা খেয়ে বললাম, যা করার দেখেই করবো, কোথাও যাবো না। ঐ ভারতের ক্যাম্পে খাওয়া-দাওয়ার খুব কষ্ট। বিদেশিরা অনেক সাহায্য দিচ্ছে, ক্যাম্পের প্রশিক্ষণ গ্রহণকারীগণ সেই পরিমাণ ভোগ করতে পারছে না, ক্যাম্প মানেই কষ্ট। গ্রামে এসে যুদ্ধ-বিগ্রহ, আক্রমণ, প্রতিরোধ এগুলো অবলোকন করছি। সেই অবধি অবরোধ, হরতাল, মিছিল, মানববন্ধন এগুলো তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্থানেও বাংলা নেচারের বাক্য শুনেছি। তবে, সময় সময় হরতাল-অবরোধকে বন্ধ হিসেবেও বলা শুনেছি।
প্রিয় সুধী, যেকোনো স্থায়ী স্বনির্ভর উন্নয়নের জন্য, অনন্তকাল টিকে থাকার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, বন্ডেজ এবং আনুষ্ঠানিকতা (Formality) আবশ্যক। আমার বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষাজীবনের লব্ধ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দ্বারা কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠান উন্নয়নে তেমন কিছু করতে পারতাম বলে সন্দেহ হয়। আমেরিকা ভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংগঠন অশোকা ফাউন্ডেশনে পাঁচ বছর কাজের উপর শিক্ষা, প্রশিক্ষণ (Job Oriented Education and Training) থেকে আমার কর্মজীবনে অফুরন্ত অবদান পেয়েছি। প্রতিষ্ঠান মানেই উন্নয়ন। প্রতিষ্ঠানকে টিকে রাখার জন্য সম্মিলিত প্রয়াস, গণতান্ত্রিক চেতনা এবং লক্ষ্যে পৌঁছার মজবুত আদর্শ অপরিহার্য। তবে, যারা Undue Advantage নিতে চান, দিতে চান, Localize পক্ষপাতিত্ব করতে চান, প্রতিষ্ঠান, গণতন্ত্র তাদের নিকট ভীতি। বর্তমানে বাংলাদেশের শাসক দলের সঙ্গী এবং বিরোধী দলের সঙ্গী কোন রাজনৈতিক দলের মধ্যে গণতন্ত্র আছে এটা তারাও হলফ করে বলতে পারবেন না। যারা দেশের গণতন্ত্র সর্বজনীনতা-বৈষম্যহীনতা প্রতিষ্ঠা করবেন, তাদের মধ্যে গণতন্ত্র না থাকলে রাষ্ট্রতে কিভাবে গণতন্ত্র আসবে। রাষ্ট্রের মধ্যে সরকারিভাবে শতশত প্রতিষ্ঠান, সংস্থা এবং বেসরকারিভাবে হাজার হাজার প্রতিষ্ঠান, সংস্থা আছে। তাদের কার মধ্যে কতটুকু গণতন্ত্র অনুশীলন হয় তার রেটিং/মূল্যায়ন হয় কি? গণতন্ত্র বহাল থাকলে পদস্থ ব্যক্তিগণের আয়ের সাথে সম্পদের সামঞ্জস্য অনুসন্ধান ক্ষেত্রপর্যায়ে গণতন্ত্রের অনুশীলন দ্বারাই উৎঘাটন হতো। আয়ের সাথে অসামঞ্জস্যিকভাবে অঢেল সম্পত্তির মালিক হওয়ার সুযোগ হতো না। বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতায় নেতৃত্বদানকারী ঐতিহ্যবাহী আওয়ামী লীগ নামক সংগঠনের সংবিধান লঙ্ঘিত হতো না (দলীয় প্রতীকের বিপক্ষে দলীয় লোকের ভোট চাওয়া, ভোট দেওয়া)। ভিত নড়বড়ে করে দৃষ্টিনন্দন বহুতল ভবন ধ্বসে গিয়ে বিপদ অবসম্ভাবী হয়। সেক্ষেত্রেই মানুষের মব (Mob) থামানোর জন্য বেসামরিক শক্তি কুলে উঠতে পারে না, সামরিক মোতায়েন করতে হয়। শেখ মুজিব বলেছিলেন, “পাকিস্থানীরা সব নিয়ে গেছে, শুধু চোরগুলো রেখে গেছে”। আজ পর্যন্ত সেই চোরগুলোকে সনাক্ত করা হয় নাই, হচ্ছে না। চোরের সন্তান-সন্ততি, নাতি-পোতা এখনও চোর আছেন না সাউধ (সাধু) হয়েছেন, তারও তথ্য নাই। তাই সম্পদ আহরণের দুর্বার প্রতিযোগিতা চলছে। ফলশ্রুতিতে সৎ, সাধু মানুষদের সংক্ষুব্ধতা বেড়েছে। এদেশের দৃশ্যমান উন্নয়ন দেখে অনেক বিদেশি বন্ধুরাও ইর্ষণীয় এবং আগুনে ঘি ঢালতে পারে। তাই প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে রাগ-বিরাগ মুক্তভাবে নিরপেক্ষ তদন্ত করে ধ্বংসলীলার শ্বেতপত্র প্রকাশসহ ন্যায় ও ন্যায্যত আইনী ব্যবস্থা নিতে হবে। তখনই মানব মরণাস্ত্র নিবৃত হবে। আকাশ থেকে নিয়ন্ত্রণ, কারফিউ, বিশেষ সাধারণ ছুটি ইত্যাদি উৎপাদন রহিতমূলক আইনী নির্।
দৈনিক বিজয় নিউজ/ এম এ খালেক খান