স্বাধীনতার পর প্রথম বাজেটের আকার কমলো
দৈনিক বিজয় নিউজ বিশেষ প্রতিনিধিঃ
বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আগের বছরের তুলনায় ছোট বাজেট বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই প্রথমবারের মতো বাজেটের আকার আগের বছরের তুলনায় কমেছে। দেশে এবার ৫৫তম বাজেট উপস্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটের পরিমাণ হতে পারে ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই বাজেটে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যবসা-বাণিজ্য সহজীকরণ এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো প্রাধান্য পাবে।
ইতিহাসে বাজেটের বিবর্তন
১৯৭২ সালে তাজউদ্দীন আহমদ দেশের প্রথম বাজেট উপস্থাপন করেন, যার আকার ছিল ৭৭৬ কোটি টাকা। এরপর ধারাবাহিকভাবে বাজেটের আকার বেড়েছে। ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত বাজেটের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৮২০.৬৫ কোটি, ৯৯৫.২৩ কোটি এবং ১৫৪৯.৪৮ কোটি টাকা। জিয়াউর রহমানের আমলে (১৯৭৬-১৯৭৮) তিনটি বাজেটে বরাদ্দ ছিল যথাক্রমে ১৮৬৭.৮৭ কোটি, ২০৮৬.৯৬ কোটি এবং ২৪৪৩.৯৬ কোটি টাকা। এরশাদের শাসনামলেও (১৯৮২-১৯৯০) বাজেট বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকে। ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এলে বাজেটের আকার বাড়তে থাকে। ১৯৯১-৯২ অর্থবছরে বাজেট ছিল ১৫,৫৮৩.২৫ কোটি টাকা, যা ১৯৯৫-৯৬ সালে দাঁড়ায় ২৪,৭০৭ কোটি টাকায়। আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথম মেয়াদে (১৯৯৬-২০০১) বাজেটের আকার ২৫,২৫৮ কোটি থেকে বেড়ে ৪৪,৭৬৫ কোটি টাকায় পৌঁছায়।
২০০১-২০০৬ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় বাজেটের পরিমাণ ৪৪,৮৫৪ কোটি থেকে বেড়ে ৬৯,৭৪০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেও (২০০৭-২০০৯) বাজেট কমেনি, বরং ৮৭,১৩৭ কোটি থেকে ৯৯,৯৬২ কোটি টাকায় পৌঁছায়। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাজেটের আকার দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ২০০৯-১০ অর্থবছরে বাজেট ছিল ১ লাখ ১৩ হাজার ৮১৯ কোটি টাকা, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছায়। তবে অর্থনৈতিক সংকট, দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের প্রভাবে এবার বাজেট সংকুচিত হচ্ছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটের বৈশিষ্ট্য
ইতিহাসে প্রথম সংকোচন: চলতি বছরের তুলনায় বাজেট ৭ হাজার কোটি টাকা কমে ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা হতে পারে। মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থান: মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। সামাজিক নিরাপত্তা: স্বাস্থ্য, শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি পেতে পারে। গ্রামীণ উন্নয়ন: গ্রামীণ অবকাঠামো ও উদ্যোক্তা উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, "বাজেটের আকার ছোট হওয়া ইতিবাচক। বড় বাজেট মানেই ভালো বাজেট নয়, বরং বাস্তবসম্মত ও কার্যকর বরাদ্দ গুরুত্বপূর্ণ।" অর্থনীতিবিদ ড. মাহবুব উল্লাহ মন্তব্য করেন, "গত কয়েক বছরের বাজেট সরকারবান্ধব ছিল, জনবান্ধব নয়। এবারের বাজেটে দুর্নীতি রোধ ও প্রকৃত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে।"
সংশোধিত বাজেটের চিত্র
২০২৪-২৫ অর্থবছরের মূল বাজেট ছিল ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা, যা পরে সংশোধন করে সাড়ে ৭ লাখ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটও সংশোধিত হয়ে ৭ লাখ ১৪ হাজার ৪১৮ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এবার সংকোচনমূলক বাজেট প্রস্তাব করা হচ্ছে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে।
দৈনিক বিজয় নিউজ/ মোঃ নাঈম আহমেদ