বরিশালে বিএনপিতে প্রার্থী জটিলতা, জামায়াতের আত্মবিশ্বাসী অবস্থান

বরিশালে বিএনপিতে প্রার্থী জটিলতা, জামায়াতের আত্মবিশ্বাসী অবস্থান
ছবিঃ মোঃ নাঈম আহমেদ

দৈনিক বিজয় নিউজ বিশেষ প্রতিনিধিঃ

বরিশালের ছয়টি সংসদীয় আসনে বিএনপির প্রার্থী নির্বাচন নিয়ে জটিলতা চললেও জামায়াতে ইসলামী ইতোমধ্যে সবকটি আসনে তাদের প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে। ১০টি উপজেলা ও বরিশাল সিটি করপোরেশন নিয়ে গঠিত এই জেলায় ৬টি আসনে বিএনপির অন্তত ৩০ জন সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম শোনা যাচ্ছে। তাদের অধিকাংশই নানাভাবে মাঠে সক্রিয়, আর অনেকে আনুষ্ঠানিকভাবে না নামলেও গোপনে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এ পরিস্থিতিতে বিএনপির নেতা-কর্মীরা দলগতভাবে নানা দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন।

আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে এসব আসনে বিএনপিসহ বিভিন্ন দল তৎপর। তবে বিএনপির বাইরে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সাংগঠনিক কার্যক্রম বিশেষভাবে লক্ষণীয়। অন্যদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কিছু সাংগঠনিক তৎপরতা দেখা গেলেও নির্বাচনকেন্দ্রিক কার্যক্রম প্রায় অনুপস্থিত।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বরিশালের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে মূলত বিএনপিই রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন সম্মেলন না হওয়া ও নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব দলকে স্থবির ও নানাভাবে বিভক্ত করেছে। বিপরীতে জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী চূড়ান্ত করে অনেকটাই নির্ভার। চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশেরও এ সমস্যা নেই।

বরিশালের প্রতিটি সংসদীয় আসনেই বিএনপির একাধিক প্রার্থী সক্রিয়। দলের নেতৃত্ব ও এলাকায় প্রভাব বিস্তার নিয়ে বিদ্যমান বিভেদ নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনীতির প্রভাবে আরও গভীর হয়েছে।

বিগত দিনে বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে অংশ নিলেও এবার জামায়াত আলাদা প্রার্থী দিচ্ছে। গত ২১ জুন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বরিশালসহ বিভাগের ২১টি আসনে দলের প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করেছেন। জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুয়াযযম হোসাইনের দাবি, জামায়াত জোটে থাকুক বা না থাকুক, সর্বত্রই (৩০০ আসনে) নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনার অভিজ্ঞতা তাদের আছে। হাসিনা সরকারের পতনের পর জনগণের মধ্যে নতুন স্বপ্নের জন্ম হয়েছে; এবার তারা জামায়াতকে ঘিরেই সেই নতুন স্বপ্ন দেখতে চায় বলে তিনি মন্তব্য করেন।

বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীরা এলাকায় সভা-সমাবেশ, রমজানে ইফতার মাহফিল, ঈদ পুনর্মিলনী ও সামাজিক অনুষ্ঠানে নিয়মিত অংশ নিচ্ছেন। ঈদুল আজহার পরও তাদের এই তৎপরতা অব্যাহত ছিল।

আসনওয়ারি অবস্থা:

বরিশাল-১ (গৌরনদী-আগৈলঝাড়া): বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক সংসদ সদস্য জহিরউদ্দিন স্বপন (পূর্বে বাধার মুখে পড়তেন, এখন নিয়মিত আসছেন), কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক আকন কুদ্দুসুর রহমান, জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আবদুস সোবাহান সক্রিয়। জামায়াতের প্রার্থী: মাওলানা কামরুল ইসলাম।

বরিশাল-২ (উজিরপুর ও বানারীপাড়া): বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এস সরফুদ্দিন আহমেদ (সান্টু) (সরকার পতনের পর সক্রিয়), চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন (আলাল) (এ আসন বা বরিশাল-৫ থেকে মনোনয়ন চাইতে পারেন বলে গুঞ্জন), কেন্দ্রীয় কমিটির সহ–বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক কাজী রওনাকুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় সদস্য দুলাল হোসেন, ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদ (জুয়েল) প্রমুখ সক্রিয়। জামায়াতের প্রার্থী: আবদুল মান্নান।

বরিশাল-৩ (বাবুগঞ্জ-মুলাদী): বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমান, কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জয়নুল আবেদীন, জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সহসাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান আসাদ (ইতোমধ্যে গণসংযোগ শুরু করেছেন) মনোনয়নপ্রত্যাশী। আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদও সক্রিয়। জামায়াতের প্রার্থী: জাহির উদ্দিন মুহাম্মদ বাবর।

বরিশাল-৪ (হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জ): বিএনপির কেন্দ্রীয় সদস্য ও সাবেক সংসদ সদস্য মেজবা উদ্দিন ফরহাদ এবং স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক রাজীব আহসান সক্রিয়। তাদের কার্যক্রমে দল স্থানীয়ভাবে দুই ধারায় বিভক্ত। জামায়াতের প্রার্থী: মাওলানা আবদুর জব্বার।

বরিশাল-৫ (সদর-সিটি করপোরেশন): গুরুত্বপূর্ণ এ আসনে পাঁচবারের সংসদ সদস্য, সাবেক মেয়র ও জাতীয় সংসদের হুইপ মজিবর রহমান সরোয়ার (মহানগর নেতৃত্ব বিরোধীদের হাতে থাকলেও তাদের অন্তর্দ্বন্দ্বে তাঁর সুবিধা হতে পারে) ছাড়াও কেন্দ্রীয় সদস্য আবু নাছের মোহাম্মদ রহমাতুল্লাহ (সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে গণসংযোগ করছেন), কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক (পদ স্থগিত) বিলকিস আক্তার জাহান (শিরিন), কেন্দ্রীয় সদস্য এবায়েদুল হক চান, মহানগর আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান খান প্রমুখ মনোনয়নপ্রত্যাশী। মজিবর রহমান সরোয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে বিএনপি আন্দোলনে সক্রিয় ও জনপ্রিয় নেতাকেই মনোনয়ন দেবে এবং বরিশালে দলের প্রার্থীকেই ভোটাররা সমর্থন করবেন। জামায়াতের প্রার্থী: মুয়াযযম হোসাইন।

বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ): বিএনপির দক্ষিণ জেলা আহ্বায়ক ও সাবেক সংসদ সদস্য আবুল হোসেন খান এবং জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম খান (রাজন) সক্রিয় মনোনয়নপ্রত্যাশী। জামায়াতের প্রার্থী: মাওলানা মাহমুদুন্নবী।

বিএনপির কেন্দ্রীয় বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আকন কুদ্দুসুর রহমান প্রার্থীসংখ্যা বেশি হওয়াকে দলের বড় আকারের স্বাভাবিক ফল বলে উল্লেখ করে বলেন, হাসিনাবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয়, নির্যাতিত নেতা-কর্মীদের পাশে থাকা এবং ৫ আগস্টের পর ভাবমূর্তি উজ্জ্বল রাখা নেতারাই মনোনয়ন দৌড়ে এগিয়ে থাকবেন। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এ বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেবেন বলে তিনি মন্তব্য করেন।

দৈনিক বিজয় নিউজ/ মোঃ নাঈম আহমেদ