জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধের দাবি: রাজনৈতিক কৌশল নাকি নীতিগত প্রশ্ন?
দৈনিক বিজয় নিউজ বিশেষ প্রতিনিধিঃ
জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করার দাবিতে সাম্প্রতিক তৎপরতা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে: শেখ হাসিনার পতন ও পলায়নের এক বছরেরও বেশি সময় পর হঠাৎ করেই কেন এই দাবি জোরালো হলো? অনেকের মনে এই ভাবনা জাগতে পারে যে, শেখ হাসিনার অবৈধ ক্ষমতা দখলের পেছনে জাতীয় পার্টি একটি ‘সহযোগী’ (Collaborator) ভূমিকা পালন করেছিল। তাহলে, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবিতে যারা আন্দোলন করেছিলেন, তারা কেন প্রথম থেকেই জাতীয় পার্টিসহ অন্যান্য সহযোগী দলগুলোকেও একই প্যাকেজে নিষিদ্ধের দাবি তুললেন না?
জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধ হবে কিনা, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। বরং, এই ইস্যুটি বর্তমান রাজনীতির একটি ‘খেলার ঘুঁটি’-তে পরিণত হয়েছে। তাই, ঘুঁটির চেয়ে এই ‘খেলা’টি বোঝা এবং এর পেছনের রাজনৈতিক গণনা বিশ্লেষণ করাই জরুরি।
ক্ষোভ এবং রাজনৈতিক ক্যালকুলাস দীর্ঘ সময় ধরে চালানো ভয়ংকর স্বৈরশাসনের মাধ্যমে দেশটিকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে জনগণের মধ্যে যে গভীর ও যৌক্তিক ক্ষোভ ছিল, তা থেকেই দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার দাবির জন্ম। তবে, বিষয়টি শুধু ক্ষোভের নয়; এর পেছনে একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক কৌশলও কাজ করেছে। একই কৌশলগত হিসাব-নিকাশ এখন জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধের দাবির পেছনেও সক্রিয়। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, আওয়ামী লীগের অপশাসন টিকিয়ে রাখতে জাতীয় পার্টির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
নির্বাচনী হাইপ এবং ভবিষ্যতের আশঙ্কা ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করা হয়েছে, যা বিএনপি ও তার মিত্রদের বাদে অন্য কেউ স্বাগত জানায়নি। আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞার কারণে তারা নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না বলে ধরে নেওয়ায়, অনেকের ধারণা জামায়াতে ইসলামী এখন দ্বিতীয় প্রধান দলে পরিণত হয়েছে (যদিও বিএনপির তুলনায় তাদের জনসমর্থন অনেক পিছিয়ে)।
এখানেই মূল সমস্যা শুরু। ৫ই আগস্ট-পরবর্তী সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জামায়াত ও তার অ্যাক্টিভিস্টদের তৎপরতার কারণে দলটির মধ্যে, এমনকি কিছু নাগরিকের মধ্যেও, একটি ‘হাইপ’ বা বিভ্রম তৈরি হয়েছে যে তাদের ব্যাপক জনসমর্থন রয়েছে এবং তারা নির্বাচনে অনেক আসন জিতবে। অন্যদিকে, গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃত্বদানকারী বেশ কয়েকজন মুখ্য ব্যক্তিত্বের উপস্থিতি এবং অন্তর্বর্তী সরকারের বিশেষ সুবিধাদির কারণে জাতীয় পার্টি (এনসিপি) অল্প সময়ের মধ্যেই মিডিয়ায় ব্যাপক গুরুত্ব পেয়েছে।
এখন প্রশ্ন হলো, জামায়াত ও এনসিপি কি তাদের প্রত্যাশিত সংখ্যক আসনে জিততে পারবে? যদি তারা এই ‘হাইপ’-এর কাছাকাছিতেও না পৌঁছাতে পারে, তাহলে তাদের ভবিষ্যৎ রাজনীতি মারাত্মক সংকটে পড়বে। এই আশঙ্কা থেকেই সম্ভবত জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করার চাপ বাড়ানো হচ্ছে, যাতে একটি শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীকে নির্বাচনের মাঠ থেকে সরানো যায়।
বিএনপির জন্য চ্যালেঞ্জ এবং জাতীয় পার্টির ভূমিকা পর্যবেক্ষকদের কাছে এটি স্পষ্ট যে, জামায়াত ও এনসিপিকে উল্লেখযোগ্য আসন পেতে হলে বিএনপির সাথে বড় ধরনের আসন বণ্টনের চুক্তিতে যেতে হবে। কিন্তু আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বিশাল জয়ের দিকে তাকিয়ে থাকা বিএনপি কেন তাদের সাথে এমন সমঝোতা করবে?
এখানেই জাতীয় পার্টির গুরুত্ব। দলটির নিজস্ব জনশক্তি ও সমর্থন রয়েছে। ধারণা করা হয়, আওয়ামী লীগের প্রাক্তন সমর্থকদের অনেকেই জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে বা তাদের প্রতীকে নির্বাচন করতে পারেন। যদি জাতীয় পার্টি তার নিজের ভোট ও আওয়ামী লীগের ভোট একত্রিত করতে পারে, তাহলে তারা প্রত্যাশার চেয়েও ভালো ফল করতে পারে, যা জামায়াতের ‘দ্বিতীয় প্রধান দল’ হওয়ার আকাঙ্ক্ষাকেই হুমকির মুখে ফেলবে।
যদি জামায়াত, এনসিপি বা ইসলামী আন্দোলন নির্বাচন বর্জনও করে, তাহলেও জাতীয় পার্টি মাঠে থেকে বিএনপির বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী প্রার্থী হয়ে দাঁড়াতে পারে। জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করে এই বিকল্পটিকেও যদি সরিয়ে ফেলা হয়, এবং বিরোধী জোটের দলগুলো যদি নির্বাচনে না যায়, তাহলে প্রশ্ন উঠবে যে নির্বাচন আদৌ হবে কিনা, আর হলেও তা কতটা গ্রহণযোগ্য হবে।
উপসংহার: অস্থিতিশীলতার পথে? ছোট দলগুলো কর্তৃক বড় দলকে চাপে রাখার কৌশল এই অঞ্চলের রাজনীতিতে নতুন নয়। তবে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে মূল আশঙ্কা হলো, এই সমস্ত কার্যক্রম কি আসলে ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে বিঘ্নিত করার একটি পরিকল্পিত প্রচেষ্টা? নির্বাচন বানচাল হয়ে গেলে দেশের যা-ই হোক, কিছু দল ও ব্যক্তির ব্যাপক সুবিধা হবে।
বাংলাদেশ ইতিহাসের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। ১৫ বছরের অপশাসনের পর গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক মুক্তি ও সুশাসনের পথে ফিরে আসার জন্য একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অপরিহার্য। ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে, তারও আগে, এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া শুধু গণতান্ত্রিক ধারা ফিরিয়ে আনার জন্যই নয়, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্যও অত্যন্ত জরুরি। নানা শর্ত দিয়ে নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়া বা বানচাল করার চেষ্টা দেশ ও জাতির জন্য একটি মারাত্মক নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করছে।
দৈনিক বিজয় নিউজ/ মোঃ নাঈম আহমেদ