রাজশাহীর কেশর বাজারে মাংসের আড়ালে ভয়াবহ প্রতারণা গর্ভবতী গাভী জবাই, রোগাক্রান্ত মাংস বিক্রি ও প্রশাসনিক নজরদারির প্রশ্ন

রাজশাহীর কেশর বাজারে মাংসের আড়ালে ভয়াবহ প্রতারণা গর্ভবতী গাভী জবাই, রোগাক্রান্ত মাংস বিক্রি ও প্রশাসনিক নজরদারির প্রশ্ন
ছবিঃ মোঃ রাজিব খাঁন

দৈনিক বিজয় নিউজ বিশেষ প্রতিনিধিঃ

রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার কেশরহাট পৌর বাজার একসময় পরিচিত ছিল সুস্বাদু গরুর মাংস ও কালাভুনার জন্য। আশপাশের উপজেলা ও জেলা থেকেও মানুষ এখানে ভিড় করতেন স্বাদের টানে। তবে সেই বাজারেই এখন ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে এক ভয়ংকর জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি—গর্ভবতী গাভী, অসুস্থ ও রোগাক্রান্ত গরু জবাই করে নির্বিঘ্নে মাংস বিক্রির অভিযোগে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে পুরো এলাকায়। ভাগাড়ে বাছুরের লাশ, প্রকাশ্যে আসে গোপন অপরাধ, শনিবার সকালে কেশরহাট বাজারসংলগ্ন মাছ বাজারের ভাগাড়ে একটি পা কাটা মৃত বাছুরের লাশ উদ্ধার করা হয়। স্থানীয়দের ধারণা, এটি কোনো স্বাভাবিক মৃত্যু নয়; বরং গর্ভবতী গাভী জবাইয়ের সময় গর্ভ থেকে বের হওয়া বাছুরটি আলামত নষ্ট করতে ভাগাড়ে ফেলে দেওয়া হয়েছে। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসতেই বাজারে ছড়িয়ে পড়ে ক্ষোভ ও আতঙ্ক। কারণ, ততক্ষণে ওই গাভীর মাংস বিক্রি হয়ে গেছে স্থানীয় বিভিন্ন হোটেল ও সাধারণ ক্রেতাদের কাছে। জবাইয়ের আগে নেই কোনো স্বাস্থ্য পরীক্ষা স্থানীয় সূত্র জানায়, শনিবার হাটবার হওয়ায় বাজারের তিনটি কসাইখানায় ভোরে মোট ছয়টি গরু জবাই করা হয়। এর মধ্যে অন্তত একটি ছিল গর্ভবতী গাভী। আশঙ্কাজনক বিষয় হলো—জবাইয়ের আগে কোনো গরুরই স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়নি, ছিল না প্রাণিসম্পদ বিভাগের কোনো ছাড়পত্র।

ফলে কোন কসাই গর্ভবতী গাভী জবাই করেছে, তা নির্দিষ্ট করে শনাক্ত করা যাচ্ছে না। এতে বোঝা যায়, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং একটি সুসংগঠিত অনিয়ম। নির্দিষ্ট কসাই, পুরনো অভিযোগ স্থানীয়দের মতে, কেশরহাট বাজারে নিয়মিত গরু জবাই করে মাংস বিক্রি করেন মুকুল, কাদের ও বাচ্চু নামের তিন কসাই। এর আগেও কাদের কসাইয়ের বিরুদ্ধে ল্যাম্পি স্কিন ডিজিজে আক্রান্ত গাভী জবাই করে মাংস বিক্রির অভিযোগ উঠেছিল। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব কসাই দীর্ঘদিন ধরেই অসুস্থ, জরাজীর্ণ ও গাভী গরু জবাই করে আসছেন, আর কম দামে মাংস পাওয়ার লোভে বাজারের একাধিক হোটেল মালিক সেই মাংস কিনে রান্না করে পরিবেশন করছেন সাধারণ মানুষের কাছে। হোটেলের প্লেটে ঝুঁকিপূর্ণ মাংস কেশরহাট বাজারের হোটেলগুলোতে প্রতিদিন বিক্রি হচ্ছে কালাভুনা, মাংসের ঝোল, ভুনা খিচুড়ি। ভোক্তারা জানেন না, এই খাবারের কাঁচামাল আসছে কোন উৎস থেকে। সচেতন মহলের মতে, রোগাক্রান্ত বা গর্ভবতী গাভীর মাংস খাওয়ানো সরাসরি জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি।

প্রশাসনিক তৎপরতা—অপরাধের তুলনায় যথেষ্ট? ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর উপজেলা প্রশাসন কেশরহাট বাজারে অভিযান চালায়। কয়েকটি হোটেলকে জরিমানা করা হলেও মূল অভিযুক্ত কসাইখানাগুলো ততক্ষণে মাংস বিক্রি করে সটকে পড়ে। উপজেলা স্যানিটারি ইন্সপেক্টর ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থাকার কথা জানালেও স্থানীয়দের অভিযোগ—তার অজ্ঞাতসারে নয়, বরং প্রশাসনের একটি অংশের নীরবতার সুযোগেই এই অবৈধ ব্যবসা দীর্ঘদিন ধরে চলছে। কর্তৃপক্ষের বক্তব্য মোহনপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এস এম মঈনুদ্দীন জানান, উদ্ধার করা মৃত বাছুরটি সুরতহাল রিপোর্টের জন্য উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. খন্দকার সাগর আহম্মেদ বলেন, তদন্তের জন্য লোক পাঠানো হয়েছে। গর্ভবতী বা রোগাক্রান্ত গরু জবাইয়ের প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কেশরহাট পৌর প্রশাসক ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) জোবায়দা সুলতানা জানান, বিষয়টি সম্পর্কে প্রশাসন অবগত রয়েছে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শেষ কথা গর্ভবতী গাভী জবাই শুধু নৈতিক অপরাধ নয়, এটি আইনত দণ্ডনীয়। তবুও কেশরহাট বাজারে বছরের পর বছর ধরে এ ধরনের কর্মকাণ্ড চলতে থাকা প্রশাসনিক নজরদারির বড় ধরনের ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়। প্রশ্ন রয়ে যায়—মানুষের স্বাস্থ্যের ঝুঁকি নিয়ে এই অবৈধ ব্যবসা আর কতদিন চলবে? কেশরহাট বাজার কি সত্যিই নিরাপদ, নাকি প্রতিদিন অজান্তেই বিষ খাচ্ছেন ভোক্তারা?

দৈনিক বিজয় নিউজ / মোঃ রাজিব খাঁন