মহাসড়কের অংশ দখল করে এভাবেই দোকানপাট গড়ে তোলা হয়েছে; সাঁথিয়ায় মহাসড়ক দখল করে বাজার, প্রভাবশালীদের পকেটে যাচ্ছে খাজনা
দৈনিক বিজয় নিউজ প্রতিনিধি:
পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার অন্যতম বাণিজ্যিক কেন্দ্র বনগ্রাম বাজারে ঢাকা-পাবনা মহাসড়ক ও ফুটপাত এর সিকি কি.মি দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে অবৈধ অস্থায়ী হাট। এক শ্রেণির প্রভাবশালী চক্রের ছত্রছায়ায় চলা এই নৈরাজ্যের কারণে মহাসড়কের মোড় সবসময় যানজটে স্তব্ধ হয়ে থাকছে। অন্যদিকে, ঘর ভাড়া বাঁচিয়ে ফুটপাতে দোকান বসিয়ে রমরমা বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন একদল ব্যবসায়ী, যার নেপথ্যে কাজ করছে শক্তিশালী একটি চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট। সরেজমিনে বনগ্রাম বাজারে গিয়ে দেখা যায়, ঢাকা-পাবনা মূলমহাসড়কের ওপরই কাঁচাবাজার, ফলের দোকান, মাংসের দোকান এবং গরম তেলের কড়াই স্থাপন করে ভাজাপোড়ার দোকানসহ হরেক রকমের বসানো হয়েছে। অনেক ব্যবসায়ীর মাসিক ঘর ভাড়া নেওয়ার সক্ষমতা থাকলেও তা বাঁচাতে তারা বেছে নিয়েছে এই অবৈধ পথ। অভিযোগ রয়েছে, এসব ব্যবসায়ীরা ঘর ভাড়া বাবদ মাসে ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা বাঁচানোর বিনিময়ে প্রভাবশালী চক্রকে প্রতিদিন ১০০ টাকা বা ৫০ টাকা করে ‘খাজনা’ বা চাঁদা প্রদান করেন। এই অবৈধ কারবারে এক সময় এক গ্রুপ সক্রিয় থাকলেও এখন অন্য প্রভাবশালীরা এর নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। মহাসড়ক দখলকারী এই ব্যবসায়ীদের অনেকরই দৈনিক আয় ২ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত, যা বাজারের অনেক বড় ব্যবসায়ির চেয়েও বেশি।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বনগ্রাম বাজারের পুরাতন রূপালী ব্যাংক সংলগ্ন এলাকায় দীর্ঘ বছর ধরে নিয়মিত কাঁচা বাজার বসে আসছে। তবে সম্প্রতি কিছু অতি-মুনাফাখোর ব্যবসায়ী অধিক লাভের আশায় মূল রাস্তার মোড় ও ফুটপাত দখল করে রীতিমতো অস্থায়ী হাট বসিয়ে দিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সেখানে সাধারণ বাজারের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ দামে শাকসবজি ও তরিতরকারি বিক্রি করা হচ্ছে। এই অবৈধ ব্যবসা নির্বিঘ্ন রাখতে তারা আয়ের একটি বড় অংশ স্থানীয় চাঁদাবাজদের পকেটে দিচ্ছে। এমনকি হাইওয়ে পুলিশকেও ‘ম্যানেজ’ করে তারা এই দখলদারিত্ব ও জনভোগান্তি জিইয়ে রেখেছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। মহাসড়ক ও ফুটপাত দখল হওয়ায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। বনগ্রাম বাজারের ওপর দিয়ে প্রতিদিন বনগ্রাম প্রাইমারি স্কুল, মিয়াপুর হাই স্কুল ও কলেজ, মিয়াপুর দাখিল মাদ্রাসা, ৫-৬টি কিন্ডারগার্টেন, ৪-৫টি প্রাইভেট মাদ্রাসা এবং বনগ্রাম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় মিলিয়ে প্রায় ৭- ৮ হাজার শিক্ষার্থী যাতায়াত করে। ফুটপাত দখল করে দোকান বসায় এবং সড়কে যানজট লেগে থাকায় শিক্ষার্থীদের রাস্তা পার হতে রীতিমতো ‘যুদ্ধ’ করতে হয়। বিশেষ করে শনি ও মঙ্গলবার হাটের দিন পরিস্থিতি চরম ভয়াবহ রূপ নেয়। উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বৃহত্তম পেঁয়াজের হাট হওয়ায় পেঁয়াজ চাষি ও ব্যবসায়িদের মাল বোঝাই গাড়ি নিয়ে রাস্তা পার হতে হিমসিম খেতে হয়। অনেক বড় গরুর হাট হওয়ায় খামারি ও ব্যবসায়িদেরও একই সমস্যা পোহাতে হয়। মহাসড়কের বাসগুলোও দীর্ঘ সময় জটে আটকে থাকে।
মহাসড়কের পাশে সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) একটি সাইনবোর্ড রয়েছে, যেখানে স্পষ্টভাবে লেখা আছে— সড়কের উভয় পাশের ১০ মিটারের মধ্যে দোকানপাট বা কোনো কিছু রাখা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু দখলদার ব্যবসায়ীরা সেই সাইনবোর্ডটির ওপরই চালা দিয়ে নির্বিঘ্নে দোকান চালিয়ে যাচ্ছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহলকে ‘ম্যানেজ’ করে দীর্ঘদিন ধরে রূপালী ব্যাংক পুরাতন ভবনের কাছ থেকে শুরু করে হাটের সংযোগস্থল পর্যন্ত এই অবৈধ ব্যবসা চলছে। কয়েক বছর আগে পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসন ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে এসব অবৈধ দোকান উচ্ছেদ করলেও বর্তমানে কোনো অভিযান নেই। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, এই দখলদার ব্যবসায়ীরা মোটেই ‘গরীব’ নন, বরং তারা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে জায়গা দখল করে রেখেছেন। যখনই উচ্ছেদের কথা ওঠে, তখনই এক শ্রেণির সুবিধাভোগী মহল তাদের পক্ষ নিয়ে প্রশাসনকে বাধা দেয়। ফলে ভোগান্তি কমার কোনো লক্ষণ নেই। দীর্ঘ যানজটের কারণে সম্প্রতি এখানে বেশ কয়েকটি ছোটখাটো দুর্ঘটনাও ঘটেছে। জনস্বার্থে এবং মহাসড়কের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে অবিলম্বে এই অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল ও অভিভাবকেরা।
এ বিষয়ে সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিজু তামান্না জানান, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত নন। মহাসড়ক ও ফুটপাত দখল করে জনভোগান্তি সৃষ্টির বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখা হবে। দ্রুতই খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এদিকে সওজ এর নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল মনসুর আহমেদ জানান, তিনি বিষয়টি জানেন না। তিনি তার অফিসের একজন উপ-সহকারী প্রেকৌশলীর সাথে যোগাযোগ করতে বলেন।
দৈনিক বিজয় নিউজ/ এম এ খালেক খান