পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ দুর্বল করার পথে সংসদ, শঙ্কায় সংস্কার
পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশটি সংশোধন করে বিল হিসেবে উপস্থাপনের সুপারিশ। কমিশনের ক্ষমতা আরও খর্ব হতে পারে।
দৈনিক বিজয় নিউজ নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকাঃ
পুলিশ সংস্কারের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক জারি করা ‘পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ-২০২৫’ সংশোধন করে জাতীয় সংসদে বিল হিসেবে উত্থাপনের প্রক্রিয়া চলছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, অধ্যাদেশের এমন একটি ধারা বাদ দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে যেখানে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) নিয়োগে পুলিশ কমিশনের সুপারিশের বিধান রাখা হয়েছিল।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ওই অধ্যাদেশ নিয়ে মন্ত্রণালয়ভিত্তিক পর্যালোচনা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অধ্যাদেশের ১২ ধারা অনুযায়ী কমিশনের কাজ হবে আইজিপি নিয়োগের সুপারিশ করা। রাষ্ট্রের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ একটি নিয়োগ কমিশনের হাতে ছেড়ে দেওয়া যুক্তিসংগত নয় বলে প্রতিবেদনে মত দেওয়া হয়েছে। তাই এই ধারা বাদ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
সূত্র জানিয়েছে, ওই ধারা বাদ দিয়েই সংশোধিত বিলটি সংসদে উত্থাপন করা হতে পারে। অর্থাৎ, আগে থেকেই দুর্বল পুলিশ কমিশনকে আরও দুর্বল করার ইঙ্গিত মিলছে। এতে পুলিশে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
জুলাই অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া ছাত্র-জনতা ও নাগরিক সমাজের মূল দাবি ছিল পুলিশ বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও জনবান্ধব করা। কিন্তু সেই আশা ফিকে হয়ে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে।
অধ্যাদেশটি জারির সময়ই প্রশ্ন উঠেছিল। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তখনই বলেছিলেন, এতে প্রকৃত সংস্কার হয়নি; বরং ‘পুলিশ কমিশন’ নামে একটি দুর্বল সংস্থা তৈরি করা হয়েছে। এখন সেই অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করতে গিয়ে আরও দুর্বল করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন তারা।
প্রসঙ্গত, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধী দল ও মত দমন, গুম, নির্যাতন, কারচুপিসহ নানা অনাচারে পুলিশকে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। অভ্যুত্থানের সময় পুলিশ সদস্যদের একাংশ ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালায়। সরকার পতনের পর তৎকালীন আইজিপি আবদুল্লাহ আল-মামুনসহ বহু পুলিশ কর্মকর্তা গ্রেপ্তার ও কেউ কেউ দণ্ডিত হন।
বিশেষ কমিটির মতবিরোধ ও জামায়াতের ‘নোট অব ডিসেন্ট’
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, অধ্যাদেশ সংশোধনের সুপারিশ করলেও বিশেষ কমিটিতে থাকা জামায়াতে ইসলামীর তিন সংসদ সদস্য (মো. মুজিবুর রহমান, রফিকুল ইসলাম খান ও জি এম নজরুল ইসলাম) ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছেন। তাঁরা ‘দেশের স্বার্থ ও দায়বদ্ধতা থেকে’ অধ্যাদেশটি অপরিবর্তিত রাখার পক্ষে মত দেন। তাঁদের মতে, আইজিপি নিয়োগে কমিশনের সুপারিশ পুলিশ বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও পেশাদার করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ফলে পুলিশকে ক্ষমতাসীনদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা কমবে। তাঁরা উল্লেখ করেন, ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় পুলিশ সংস্কারের উদ্যোগ নিলেও আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে তা ভেস্তে যায়।
জুলাই সনদে কী বলা আছে?
জুলাই জাতীয় সনদে ৩০টি রাজনৈতিক দল ও জোট ‘স্বাধীন পুলিশ কমিশন’ গঠনে একমত হয়। কেউ ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দেয়নি। সনদে বলা হয়, পুলিশের পেশাদারত্ব ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এবং জনবান্ধব সেবা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এই কমিশন গঠিত হবে। কমিশনের উদ্দেশ্য হবে—১) পুলিশ আইনানুগ ও প্রভাবমুক্তভাবে দায়িত্ব পালনে সক্ষম হবে, ২) পুলিশ সদস্যদের নিজেদের অভিযোগ নিষ্পত্তি, ৩) নাগরিকদের অভিযোগ নিষ্পত্তি। কমিশনের গঠনপ্রক্রিয়া সংসদীয় আইনে নির্ধারিত হবে। তবে আইন প্রণয়নে ছয়টি প্রস্তাব ‘বিবেচনায় নিতে পারবে’ বলা হয়েছে, বাধ্যতামূলক নয়।
অধ্যাদেশ জারির পথচলা ও দুর্বলতার ইতিহাস
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার তিন মাস পর (৩ অক্টোবর ২০২৪) পুলিশ সংস্কার কমিশন গঠিত হয়। ৯ সদস্যের এই কমিশন ১৫ জানুয়ারি ২০২৫-এ প্রতিবেদন দেয়। তাতে পুলিশ কমিশন গঠনে নীতিগত সমর্থন জানানো হয়, কিন্তু এটি সাংবিধানিক না সংবিধিবদ্ধ হবে—সেটি বিশেষজ্ঞ মতামতের ভিত্তিতে করার কথা বলা হয়।
পরে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় ‘স্বাধীন পুলিশ কমিশন’ গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু ২৯ নভেম্বর ২০২৫-এ উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে অধ্যাদেশের খসড়া অনুমোদন না পেয়ে আরও সংশোধনের নির্দেশ দেওয়া হয়। ১ ডিসেম্বর এক বৈঠকে খসড়া নিয়ে আলোচনা হয়; সেখানে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া অনেক বিষয় চূড়ান্ত খসড়া থেকে বাদ পড়ে। তৎকালীন আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুলের নেতৃত্বাধীন কমিটির তৈরি খসড়াতেও কমিশনকে পুলিশ পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ রাখা হয়নি; বরং অধিকাংশ প্রস্তাব ছিল সুপারিশকেন্দ্রিক। পুলিশ কর্মকর্তারা তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখান। পরে খসড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গেলে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবগুলো বাদ পড়ে। আমলাতন্ত্র আইজিপি নিয়োগে কমিশনের ভূমিকার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং পুলিশকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে রাখার পক্ষে সুপারিশ করে।
আসিফ নজরুল ১১ নভেম্বর এক অনুষ্ঠানে জানান, আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠকে আমলারা আইজিপি নিয়োগের বিধানের তীব্র বিরোধিতা করেছেন। দফায় দফায় বাধার পর তৃতীয় খসড়া অনুমোদন দিয়ে ৯ ডিসেম্বর ২০২৫-এ অধ্যাদেশ জারি হয়। তখন টিআইবি একে ‘গণ-আকাঙ্ক্ষার প্রতি উপহাস, অর্থহীন ও আত্মঘাতী’ বলে মন্তব্য করে।
প্রথম খসড়ায় কমিশনকে সংবিধিবদ্ধ, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ এবং স্বশাসিত সংস্থা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। অধ্যাদেশে তা সংবিধিবদ্ধ সংস্থায় নামিয়ে আনা হয়। প্রথম খসড়ায় সরকার ও বিরোধীদলীয় দুই সংসদ সদস্যকে কমিশনে রাখার প্রস্তাব থাকলেও অধ্যাদেশ থেকে তা বাদ যায়। অধ্যাদেশের ১২ ধারায় আইজিপি নিয়োগে তিন নামের একটি প্যানেল সুপারিশের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল; সেটুকুও এখন বাদ পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ফলাফল কী দাঁড়াচ্ছে?
সব মিলিয়ে পুলিশ কমিশন একটি ‘কাগুজে প্রতিষ্ঠান’ হয়ে দাঁড়ানোর আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। সরকারি খরচ বাড়লেও কার্যকর সংস্কার হবে না।
প্রসঙ্গত, বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ‘ফ্যাসিস্ট সরকার কর্তৃক পুলিশের যথেচ্ছ ব্যবহারের’ নিন্দা জানিয়ে ‘সেবাবান্ধব পুলিশ’, ‘স্বাধীন ও শক্তিশালী পুলিশ বাহিনী’ এবং ‘জবাবদিহিমূলক, দায়িত্বশীল ও কল্যাণমূলক পুলিশ প্রশাসন’ গঠনের অঙ্গীকার করে।
অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসার কল্যাণ সমিতির সভাপতি এম আকবর আলী বলেন, সংস্কার কমিশন গঠন থেকে খসড়া প্রণয়নের প্রতিটি ধাপে বিভিন্ন পক্ষ নিজেদের স্বার্থে বাধা সৃষ্টি করেছে। পরে জন-আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে গিয়ে তাড়াহুড়া করে অধ্যাদেশ জারি হয়েছে। তিনি অনুমোদিত পুলিশ কমিশনকে ‘লোকদেখানো’ আখ্যা দিয়ে বলেন, উপদেষ্টাদের কমিটির দেওয়া প্রস্তাবই ছিল দুর্বল, সেটিকে আরও দুর্বল করে অধ্যাদেশ জারি হয়েছে। এভাবে কোনো কার্যকর প্রতিষ্ঠান তৈরি হবে না। তিনি আশা প্রকাশ করেন, পুলিশ পুনর্গঠনে বর্তমান সরকার সদিচ্ছার সঙ্গে বিষয়গুলো পুনর্বিবেচনা করবে।
সংসদে অধ্যাদেশ পর্যালোচনা
অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে সংসদের বিশেষ কমিটি ৯৮টি অপরিবর্তিত, ১৫টি সংশোধিত আকারে বিল উত্থাপনের সুপারিশ করেছে। বাকি ২০টির মধ্যে ৪টি বাতিল ও ১৬টি এখনই উত্থাপন না করার সুপারিশ করা হয়েছে—যার অর্থ এগুলো কার্যকারিতা হারাবে। পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ সংশোধিত আকারে বিল উত্থাপনের তালিকায় রয়েছে।
দৈনিক বিজয় নিউজ/ ই