কুমিল্লায় ভুল চিকিৎসায় প্রসূতির মৃত্যুর ঘটনায় উত্তপ্ত ব্রাহ্মণপাড়া: থমথমে পরিস্থিতি ও ক্ষোভে ফুঁসছে এলাকাবাসী
দৈনিক বিজয় নিউজ বিশেষ প্রতিনিধিঃ
কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ায় ভুল অস্ত্রোপচারের কারণে পপি আক্তার (২১) নামের এক প্রসূতির মৃত্যুর ঘটনায় আজও পুরো এলাকায় চরম থমথমে ও উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি বিরাজ করছে। আল বারাকা হাসপাতাল নামের ওই ক্লিনিককে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষ ও স্বজনদের মাঝে তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভের আগুন দাউদাউ করে জ্বলছে। চিকিৎসকদের চরম অবহেলা এবং দায়িত্বহীনতার কারণে একটি তাজা প্রাণ ঝরে যাওয়ার ঘটনায় এলাকার বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত সতর্কতা নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় ইতোমধ্যে পাঁচ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। নিহত প্রসূতি পপি আক্তার উপজেলার সাহেবাবাদ ইউনিয়নের সাহেবাবাদ গ্রামের মো. মোসলেম উদ্দিনের মেয়ে এবং একই ইউনিয়নের টাকই অবিদ সরকার বাড়ির মো. মোহন মিয়ার স্ত্রী।
চিকিৎসায় অবহেলা ও স্বজনদের মর্মান্তিক অভিযোগ:
নিহতের পরিবার ও স্বজনদের সূত্রে জানা যায়, গত ৮ সেপ্টেম্বর প্রসববেদনা শুরু হলে পপি আক্তারকে উপজেলা সদরের আল বারাকা হাসপাতালে (পূর্বে যা ‘ভিশন হাসপাতাল’ নামে পরিচিত ছিল) ভর্তি করা হয়। সেখানে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাঁর সন্তান প্রসব করানো হয়। পরবর্তীতে গত ৭ সেপ্টেম্বর প্রসূতি ও তাঁর নবজাতক সন্তানকে সুস্থ ঘোষণা করে ছাড়পত্র দিয়ে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু স্বজনদের অভিযোগ, হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার পর থেকেই পপির শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। গত ১৫ সেপ্টেম্বর তিনি পুনরায় আল বারাকা হাসপাতালে গেলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক অস্ত্রোপচারের জায়গার সেলাই কেটে দেন এবং কোনো ধরনের সমস্যা নেই বলে তাঁকে অবহেলার সঙ্গে বাড়িতে ফিরিয়ে দেন।
মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার হৃদয়বিদারক পরিণতি:
পরদিন ১৬ সেপ্টেম্বর ভোরে পপির শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটলে তাঁকে দ্রুত কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাঁর অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক দেখে অবিলম্বে পুনরায় অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন। অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হওয়ার পর তাঁকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) স্থানান্তরের পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে কোনো শয্যা খালি না থাকায় বাধ্য হয়ে তাঁকে কুমিল্লা শহরের অন্য একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আজ ভোরের দিকে না ফেরার দেশে চলে যান নবজাতকের মা পপি আক্তার।
হাসপাতাল ঘেরাও, বিক্ষোভ ও থমথমে পরিবেশ:
প্রসূতির মৃত্যুর এই মর্মান্তিক খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে মানুষের মাঝে চরম অসন্তোষ দেখা দেয়। শত শত বিক্ষুব্ধ জনতা ও স্বজনরা পপির মরদেহ নিয়ে এসে আল বারাকা হাসপাতালের সামনে অবস্থান নিয়ে তীব্র বিক্ষোভ শুরু করেন। তাঁরা আল বারাকা হাসপাতালের চিকিৎসকদের ভুল অস্ত্রোপচার ও দায়িত্বহীনতাকে এই মৃত্যুর জন্য সরাসরি দায়ী করে ক্লিনিক বন্ধ এবং জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে সোচ্চার হন।
খবর পেয়ে ব্রাহ্মণপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ফারুক হোসেনের নেতৃত্বে পুলিশ বাহিনী দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে ঘটনার পর থেকেই এলাকার বাতাস ভারী হয়ে আছে এবং থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এ বিষয়ে ওসি মো. ফারুক হোসেন জানান, "আল বারাকা হাসপাতালে হট্টগোলের খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং উভয় পক্ষকে শান্ত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। এখন পর্যন্ত নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি, তবে অভিযোগ পেলে যথাযথ তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।" অপরদিকে, ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা মো. মনিরুল ইসলাম জানান, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে পুরো বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তদন্ত করার জন্য মৌখিক নির্দেশনা পাওয়া গেছে।
দৈনিক বিজয় নিউজ/ সুমন আহমেদ