এমবিবিএস চিকিৎসক পদে নিয়োগ, কিন্তু কর্মস্থলে অনুপস্থিত: অবহেলায় ভুগছে বাইশারী ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্র
দৈনিক বিজয় নিউজ নাইক্ষ্যংছড়ি (বান্দরবান) প্রতিনিধিঃ
বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বাইশারী ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসক সংকট, জনবল ঘাটতি এবং অবকাঠামোগত দুরবস্থার কারণে চরম স্বাস্থ্যসেবা সংকটে পড়েছেন প্রায় ৪০ হাজার মানুষ। স্থানীয়দের অভিযোগ, স্বাস্থ্য কেন্দ্রে এমবিবিএস চিকিৎসকের পদ থাকলেও কার্যত নিয়মিত সেবা মিলছে না। ফলে সাধারণ রোগীদের ভোগান্তি দিন দিন বাড়ছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বাইশারী ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে চিকিৎসক হিসেবে ডা. আবু মনজুরকে নিয়োগ দেওয়া হলেও যোগদানের প্রথম দিনের পর তিনি আর কর্মস্থলে নিয়মিত উপস্থিত হননি। পরবর্তীতে জানা যায়, তিনি পদোন্নতি পেয়ে উচ্চ পদে দায়িত্ব পালন করছেন। এ বিষয়ে জানতে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের টিএইচও ডা. আবু মনজুরের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি ব্যস্ত আছি, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকদের নিয়ে মিটিং করছি। এরপর তিনি দ্রুত ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
এদিকে, অবসরপ্রাপ্ত চিকিৎসক ডা. নুরুল আমিনের স্থলে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. মো. সেলিম অস্থায়ীভাবে ডা. আরিফা বেগমকে বাইশারী ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে দায়িত্ব প্রদান করেন। ডা. আরিফা বেগম জানান, তিনি ২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে যোগদান করেছেন এবং তখন থেকেই নিয়মিত রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছেন। তিনি বলেন, প্রতিদিন ৯০ থেকে ১০০ জনেরও বেশি রোগী আসে। সাধারণত জ্বর, সর্দি-কাশি, দাউদ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, দুর্বলতা, স্ক্যাবিস, কোমর ব্যথা, ডায়রিয়া ও ম্যালেরিয়া-সংশ্লিষ্ট রোগী আসে। ম্যালেরিয়ার রোগীদের প্রয়োজন অনুযায়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রেফার করা হয়। স্বাস্থ্য কেন্দ্রের অফিস সহকারী হাবিবুর রহমান জানান, জনবল সংকটের কারণে তিনি ওষুধ বিতরণ থেকে শুরু করে রোগীর ডেসিং অফিস পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজও করছেন, পাশাপাশি রোগীদের সেবায় সহযোগিতা করে যাচ্ছেন।
স্থানীয়দের দাবি, নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে কয়েকজন চিকিৎসক সপ্তাহে এক-দুই দিন ইচ্ছামতো এসে দায়িত্ব পালন করেন, তবে নিয়মিত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত হয় না। সম্প্রতি যোগদান করা মিডওয়াইফ মোসাম্মৎ রাবিয়া জানান, তিনি ৯ জুন ২০২৬ তারিখে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তবে এখন পর্যন্ত তার প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী সরবরাহ করা হয়নি। তিনি আশা প্রকাশ করেন, দ্রুত প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পৌঁছে যাবে। রোগীদের অভিযোগ, স্বাস্থ্য কেন্দ্রের টয়লেট ব্যবহার অনুপযোগী। উইপোকার মাটি ও ময়লায় ড্রেনেজ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গেছে। বেসিনগুলো ভাঙা, নেই নিরাপদ পানির ব্যবস্থা। রোগীদের জন্য নেই পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ খাবার পানি কিংবা স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থা।
এলাকাবাসীর ভাষ্য, দূর থেকে ভবনটি দেখে স্বাস্থ্য কেন্দ্রের চেয়ে পরিত্যক্ত ভবন বলেই মনে হয়। চারপাশে ঝোপঝাড়, আগাছা, মশা-মাছি ও বিভিন্ন পোকামাকড়ের বিস্তার রয়েছে। তাদের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় ওষুধ সবসময় পাওয়া যায় না এবং ওষুধ সরবরাহ নিয়েও নানা অভিযোগ রয়েছে। স্বাস্থ্য কেন্দ্রে কর্মরত চিকিৎসকদের মতে, সেবার মান উন্নত করতে জরুরি ভিত্তিতে একজন মেডিকেল অফিসার, একজন উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার, একজন ফার্মাসিস্ট এবং একজন সুইপার নিয়োগ প্রয়োজন।
এলাকার সচেতন নাগরিক ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের অভিযোগ, স্বাস্থ্য কেন্দ্রটিতে কোনো দৃশ্যমান সাইনবোর্ড নেই। দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়ন ও সংস্কারের অভাবে এটি জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। তারা স্বাস্থ্য কেন্দ্রের সার্বিক ব্যবস্থাপনা, জনবল নিয়োগ, পরিবেশ উন্নয়ন এবং নিয়মিত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তবে স্থানীয়দের তোলা দুর্নীতি, ওষুধ বিক্রি বা সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে লুটপাটের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
দৈনিক বিজয় নিউজ/ এম হাবিবুর রহমান রনি