মাদকবিরোধী অভিযানে ধরা পড়ে চুনোপুঁটি, আড়ালেই কথিত গডফাদাররা তিন জেলার সীমান্তে মাদক করিডোরের অভিযোগ: মূল হোতারা অধরা, পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
দৈনিক বিজয় নিউজ বিশেষ প্রতিনিধিঃ
চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা , কুষ্টিয়ার মিরপুর ও মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার সংযোগস্থলজুড়ে গড়ে ওঠা একটি সংঘবদ্ধ মাদক নেটওয়ার্ক দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় থাকলেও এর কথিত মূল হোতারা এখনো আইনের নাগালের বাইরে রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি , একের পর এক মাদকবিরোধী অভিযানে গ্রেপ্তার হচ্ছেন মূলত মাদকসেবী ও খুচরা বিক্রেতারা , অথচ যাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে , তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে সীমান্তবর্তী এলাকার আইনশৃঙ্খলা তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
এলাকাবাসী ভাষ্য অনুযায়ী , হাটবোয়ালিয়া , বড়বোয়ালিয়া , কেশবপুর , লক্ষ্মীপুর , প্রাগপুর , ওসমানপুর , ঝুটিয়াডাঙ্গা , আসাননগর , ভোলাডাঙ্গা ও মানিকদিয়া এলাকাকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে মাদক পাচারের একটি করিডোর গড়ে উঠেছে। সীমান্তঘেঁষা এসব এলাকায় সংঘবদ্ধ চক্রের তৎপরতার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় একাধিক বাসিন্দার অভিযোগ , আলমডাঙ্গা উপজেলার কেশবপুর , লক্ষ্মীপুর , প্রাগপুর ও ওসমানপুর গ্রামের বাসিন্দা রুহুল আমিনের ছেলে ইমাদুল (৪৭), হাবিবুরের ছেলে আশরাফুল (৩৫), দ্বীন মোহাম্মাদের ছেলে শামসুল (৪০), মোবারকের ছেলে চেঙ্গিস (৫০) এবং মওলার ছেলে মঞ্জিল (৪০) দীর্ঘদিন ধরে চুয়াডাঙ্গার , কুষ্টিয়ার , মেহেরপুরের সীমান্তবর্তী এলাকায় সক্রিয় মাদক নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করছেন। এলাকাবাসীর দাবি , এই চক্রের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসা , সন্ত্রাস , চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ বহুদিনের। তাদের ভাষ্য , আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে অভিযুক্তরা শক্তিশালী বলয় গড়ে তোলেন , যার প্রভাব এখনও তিন জেলার সংযোগস্থলে রয়ে গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ , মাদকবিরোধী অভিযানে খুচরা কারবারিরা গ্রেপ্তার হলেও মূল নিয়ন্ত্রকদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নেওয়ায় নেটওয়ার্কটি টিকে আছে। তবে অভিযুক্তদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এছাড়া তাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়েছে কি না , তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
জানা গেছে , গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অভিযুক্তদের কয়েকজন কিছুদিন আত্মগোপনে থাকলেও সম্প্রতি আবার এলাকায় সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। অভিযুক্তরা এলাকায় সক্রিয় হয়ে বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মীকে পিটিয়ে আহত করেছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত , তা তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারণের বিষয়। অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
প্রতিবেদন তৈরির সময় স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা আলমডাঙ্গার হাটবোয়ালিয়া পুলিশ ক্যাম্পের (এসআই) মো. রইস উদ্দিন এবং ওসমানপুর পুলিশ ক্যাম্পের (এসআই) মো. নবাব আলীর বিরুদ্ধে দায়িত্ব পালনে অবহেলার অভিযোগ করেন। তাদের দাবি , চিহ্নিত মাদক কারবারিদের বিষয়ে একাধিকবার তথ্য দেওয়ার পরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে অভিযানের তথ্য আগেই ফাঁস হয়ে যাওয়ায় অভিযুক্তরা পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়ে থাকেন বলেও অভিযোগ করেন তারা।
এদিকে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা মো. অপু মাস্টার নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধেও অভিযুক্তদের প্রভাব বিস্তারে সহযোগিতার অভিযোগ করেন। তাদের দাবি , তার আপন শ্যালিকার স্বামী বাংলাদেশ পুলিশের একজন এসপি পদমর্যাদার কর্মকর্তা। ওই কর্মকর্তার এক (বিসিএস) কোর্সমেট বর্তমানে চুয়াডাঙ্গায় কর্মরত একজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা। এই ব্যক্তিগত সম্পর্কের সূত্র ধরে অপু মাস্টার কথিত মাদক কারবারি ও সন্ত্রাসীদের বিভিন্ন বিষয় ম্যানেজ করেন এবং ওই প্রভাবের কারণে এলাকার কয়েকটি পুলিশ ক্যাম্প অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা পালন করছে না বলেও অভিযোগ করেন তারা। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা , অপু মাস্টার ও অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি , কেবল মাদকসেবী বা খুচরা বিক্রেতাদের গ্রেপ্তার করে মাদকের বিস্তার রোধ করা সম্ভব নয়। তারা বলছেন , সংঘবদ্ধ মাদক চক্রের কথিত মূল হোতাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা , অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত , গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে সীমান্তবর্তী এই অঞ্চলে মাদক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ফল আসবে না। অভিযুক্ত মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে দ্রুত আইনের মাধ্যমে গ্রেফতারের দাবি জানান এলাকাবাসী।
দৈনিক বিজয় নিউজ/ ইডি