পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশ-জার্মানি সম্পর্ক জোরদারের নতুন সম্ভাবনা।

পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশ-জার্মানি সম্পর্ক জোরদারের নতুন সম্ভাবনা।
ছবিঃ সাব্বির

দৈনিক বিজয় নিউজ  বিশেষ প্রতিনিধি:

পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশ ও জার্মানির মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও গভীর করার ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, দক্ষ জনশক্তি তৈরি, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার মাধ্যমে দুই দেশের সহযোগিতা নতুন মাত্রা পেতে পারে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তর, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান সুদৃঢ় করতে জার্মানির অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বাংলাদেশে নিযুক্ত জার্মানির রাষ্ট্রদূত ড. রুডিগার লটজ সম্প্রতি দ্য ডেইলি স্টার-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার বিকাশ এবং এশিয়ার ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ও জার্মানির পারস্পরিক সহযোগিতা আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বাণিজ্য ও বিনিয়োগে নতুন সম্ভাবনা

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প জার্মানির সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। দীর্ঘদিন ধরে জার্মানি বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের একটি উল্লেখযোগ্য বাজার হিসেবে ভূমিকা রাখছে। তবে দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত করতে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি অন্যান্য খাতেও বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।রাষ্ট্রদূত রুডিগার লটজের মতে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং শিল্পায়নের ধারাকে টেকসই করতে রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ অত্যন্ত জরুরি। এ ক্ষেত্রে চামড়াশিল্প, ওষুধশিল্প, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং উৎপাদনশীল শিল্পে জার্মান বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে।

তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের উৎপাদন সক্ষমতা, তুলনামূলকভাবে প্রতিযোগিতামূলক শ্রমব্যয় এবং ক্রমবর্ধমান বাজার জার্মান বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে পারে। তবে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, দক্ষ জনশক্তি তৈরি, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করা জরুরি।বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয় বাজারে বাণিজ্যসুবিধা ধরে রাখাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে প্রবেশাধিকার, মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি এবং অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্যসুবিধার বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে সময়োপযোগী প্রস্তুতি নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন

জ্বালানি নিরাপত্তা ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা বাংলাদেশ-জার্মানি সহযোগিতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। বাংলাদেশের শিল্প ও অর্থনীতির ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা পূরণে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।এ পরিস্থিতিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন, জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির প্রসারে দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

জার্মানির প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা ও বিনিয়োগ বাংলাদেশের শিল্প খাতকে আরও পরিবেশবান্ধব করে তুলতে সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় বাজারে পরিবেশগত মানদণ্ডের গুরুত্ব বাড়তে থাকায় বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য পরিচ্ছন্ন উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তোলাও জরুরি।রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য অনুযায়ী, পরিবেশগতভাবে টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করতে পারলে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়বে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থাও শক্তিশালী হবে।

দক্ষ জনশক্তি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ

বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করা দুই দেশের সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা। জার্মানিতে দক্ষ কর্মীর চাহিদা রয়েছে, অন্যদিকে বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক তরুণ কর্মসংস্থানের সুযোগ খুঁজছেন। যথাযথ প্রশিক্ষণ, ভাষাগত দক্ষতা এবং যোগ্যতার স্বীকৃতির মাধ্যমে এ দুই বাস্তবতার মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরি করা সম্ভব।বিশেষ করে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা, শিক্ষানবিশ প্রশিক্ষণ এবং কর্মক্ষেত্রভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়নে জার্মানির অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য কার্যকর হতে পারে।

তবে শুধু জনশক্তি পাঠানোর উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। জার্মান শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা অর্জন, জার্মান ভাষা শিক্ষা, পেশাগত যোগ্যতার স্বীকৃতি এবং অভিবাসনসংক্রান্ত নিয়ম সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে দুই দেশের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো যেতে পারে।

গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও সুশাসনের গুরুত্ব

অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ, সুশাসন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নিয়েও গুরুত্বারোপ করেছেন জার্মান রাষ্ট্রদূত। তাঁর মতে, শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসন দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য অপরিহার্য।বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তরের ক্ষেত্রে জার্মানির ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা থেকেও শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ১৯৮৯ সালে বার্লিন প্রাচীরের পতন এবং ১৯৯০ সালে জার্মানির পুনরেকত্রীকরণ দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

রাষ্ট্রদূতের মতে, জার্মানির অভিজ্ঞতা দেখায় যে গণতান্ত্রিক রূপান্তর শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, সামাজিক আস্থা তৈরি এবং ভিন্নমতের মানুষের মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠার বিষয়গুলোও জড়িত।বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং সামাজিক ঐকমত্য দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

রোহিঙ্গা সংকট ও মানবিক সহযোগিতা

বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থীর পরিস্থিতিও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দীর্ঘদিন ধরে এই সংকট মোকাবিলা করতে গিয়ে বাংলাদেশ মানবিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে।রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা অব্যাহত রাখা, শরণার্থীশিবিরে মানবিক পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরিতে জার্মানি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

রাষ্ট্রদূত মনে করেন, রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্পৃক্ততা বজায় রাখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শরণার্থীদের দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা থেকে উদ্ভূত নিরাপত্তা ও সামাজিক ঝুঁকিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

ভবিষ্যৎ সম্পর্কের দিকনির্দেশনা

বাংলাদেশ ও জার্মানির সম্পর্ক ঐতিহ্যগতভাবে বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল হলেও ভবিষ্যতে এর পরিধি আরও বিস্তৃত করার সুযোগ রয়েছে। প্রযুক্তি, উচ্চশিক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, দক্ষ জনশক্তি এবং প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নের মতো ক্ষেত্র দুই দেশের সম্পর্ককে আরও বহুমাত্রিক করে তুলতে পারে।তবে এসব সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে বাংলাদেশের নীতিগত ধারাবাহিকতা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, দক্ষ জনশক্তি এবং কার্যকর প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে জার্মানির সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অগ্রাধিকারও স্পষ্ট রাখা প্রয়োজন।

পরিবর্তনশীল আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় বাংলাদেশ-জার্মানি সম্পর্ক তাই শুধু বাণিজ্যিক স্বার্থের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পারস্পরিক আস্থা, টেকসই উন্নয়ন এবং অভিন্ন বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সহযোগিতা বাড়াতে পারলে এই সম্পর্ক দুই দেশের জন্যই নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে।

দৈনিক বিজয় নিউজ/ সাব্বির