আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি: আজকের ইরানকে গড়ে তুলেছিলেন তিনি

আল–জাজিরা

আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি: আজকের ইরানকে গড়ে তুলেছিলেন তিনি
ছবিঃ মোঃ নাঈম আহমেদ

দৈনিক বিজয় নিউজ বিশেষ প্রতিনিধিঃ

ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি (৮৬) যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত হয়েছেন। শনিবার দিবাগত রাতে এ হামলার ঘটনা ঘটে। রোববার ভোরে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়।

এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের যৌথ হামলায় খামেনি নিহত হয়েছেন।

কে এই আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি?

১৯৮৯ সালে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেন আলী খামেনি। এর আগে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে ইরানের ইসলামী বিপ্লবে সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল তার।

১৯৭৯ সালে খোমেনির নেতৃত্বে গঠিত সরকারে উপ–প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন খামেনি। ১৯৮৯ সালে খোমেনির মৃত্যুর পর ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্ট’ নামক ধর্মীয় নেতাদের পর্ষদ তাকে সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত করে। তবে তাকে এই পদে বসাতে সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন হয়েছিল।

ইরানের ইসলামী বিপ্লবের আদর্শগত পুরোধা ছিলেন রুহুল্লাহ খোমেনি। অন্যদিকে খামেনি ছিলেন সেই নেতা, যিনি ইরানের সামরিক ও আধাসামরিক কাঠামোকে শক্তিশালী করে গড়ে তোলেন। শুধু দেশের প্রতিরক্ষা নিশ্চিতই নয়, সীমান্ত পেরিয়ে প্রভাব বিস্তারেও সক্ষম হয় এই ব্যবস্থা। তাকেই ইরানের বর্তমান প্রতিরোধ সক্ষমতার মূল স্থপতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার আগে ১৯৮০–এর দশকে ইরান–ইরাক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সময় প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন খামেনি।

পশ্চিমা দেশগুলোর ইরাকের তৎকালীন নেতা সাদ্দাম হোসেনকে সমর্থনের ফলে ইরানিদের মধ্যে এক ধরনের বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছিল। এই ঘটনা পশ্চিমা দেশ, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি খামেনির গভীর অবিশ্বাস আরও দৃঢ় করে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

এই মনোভাবই তার দীর্ঘ শাসনের ভিত গড়ে দেয়। তার বিশ্বাস ছিল, ইরানকে সব সময় অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক হুমকি মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকতে হবে।

এই চিন্তা থেকেই তিনি ইসলামী বিপ্লবী বাহিনী (আইআরজিসি) –কে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেন। পরবর্তীতে এই বাহিনী গোটা অঞ্চলে ইরানের প্রভাব বিস্তারে মুখ্য ভূমিকা রাখে।

পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলায় স্বনির্ভরতা বাড়াতে ‘প্রতিরোধ অর্থনীতি’ গড়ে তোলার ওপর জোর দেন খামেনি। পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের ব্যাপারে তিনি সব সময় সন্দেহপ্রবণ ছিলেন। প্রয়োজনীয় সংস্কারের পথে তার নীতি বাধা সৃষ্টি করছে—এমন সমালোচনাও তিনি কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করতেন।

শাসনামলে তাকে অভ্যন্তরীণ নানা চ্যালেঞ্জেরও মুখোমুখি হতে হয়েছে। ২০০৯ সালের বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফল নিয়ে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হলে তা কঠোর হাতে দমন করেন তিনি। ২০২২ সালে মাসা আমিনি নামে এক কুর্দি তরুণীর পুলিশি হেফাজতে মৃত্যুর পর সারা দেশে ছড়িয়ে পড়া তীব্র আন্দোলনও কঠোরভাবে দমন করা হয়।

সম্প্রতি চলতি বছরের জানুয়ারিতে ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়ালের বড় পতনের জেরে তেহরানে ব্যবসায়ীদের বিক্ষোভ শুরু হয়, যা পরে দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্রের পতনের দাবিতে রূপ নেয়। এটাই সম্ভবত তার ৩৭ বছরের শাসনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।

জন্ম ও শিক্ষা

১৯৩৯ সালে উত্তর-পূর্ব ইরানের মাশহাদ শহরে জন্ম খামেনির। তার বাবা ছিলেন একজন প্রসিদ্ধ মুসলিম নেতা এবং ইরাকের আজারবাইজানি বংশোদ্ভূত। আজারবাইজানি এই পরিবার প্রথমে উত্তর-পশ্চিম ইরানের তাবরিজে বসবাস শুরু করলেও পরে মাশহাদে চলে আসে। সেখানে একটি আজারবাইজানি মসজিদের প্রধান ছিলেন খামেনির বাবা।

মা খাদিজা মিরদামাদিকে কোরআন ও সাহিত্যের একনিষ্ঠ পাঠক হিসেবে বর্ণনা করেছেন খামেনি। মায়ের কাছ থেকেই সাহিত্য ও কবিতার প্রতি ভালোবাসা পান তিনি। পাহলভি শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনেও তিনি মায়ের সমর্থন পেয়েছিলেন।

মাত্র চার বছর বয়সে পড়ালেখা শুরু করেন খামেনি। প্রাথমিক শিক্ষা শেষে উচ্চ বিদ্যালয়ে না গিয়ে তিনি ধর্মতাত্ত্বিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং খ্যাতনামা ইসলামি পণ্ডিতদের কাছে পড়াশোনা করেন। পরবর্তীতে নাজাফ ও কোমের শিয়া উচ্চশিক্ষার কেন্দ্রগুলোতে লেখাপড়া চালিয়ে যান। 

কোমে অবস্থানকালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনিসহ বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট ধর্মীয় নেতার ঘনিষ্ঠ হন তিনি। শাহ শাসনবিরোধী আন্দোলনের কারণে তরুণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে খোমেনি তখন জনপ্রিয় ছিলেন। সেখান থেকেই রাজনীতিতে তার সম্পৃক্ততা শুরু। শাহ শাসনামলে একাধিকবার গ্রেপ্তার ও নির্বাসিত হন তিনি। ১৯৭৮ সালে ইসলামী বিপ্লব শুরু হলে বিক্ষোভে অংশ নিতে ফিরে আসেন।

সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে যাত্রা

১৯৭৯ সালে ইসলামী বিপ্লব সফল হওয়ার পর নতুন শাসনব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন খামেনি। ১৯৮০ সালে তিনি অল্প সময়ের জন্য প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও ইরান-ইরাক যুদ্ধ শুরু হলে ইসলামী বিপ্লবী বাহিনীর তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৮১ সাল তার জন্য ছিল গুরুত্বপূর্ণ। সে বছর এক গুপ্তহত্যা প্রচেষ্টা থেকে বেঁচে গেলেও তার ডান হাত অকেজো হয়ে যায়। একই বছর তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন, যা ছিল কোনো ধর্মীয় নেতার প্রেসিডেন্ট হওয়ার প্রথম ঘটনা।

১৯৮৯ সালে রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুতে ইসলামী বিপ্লব এক সংকটে পড়ে। খোমেনির আগেই মনোনীত উত্তরসূরি হোসেইন আলী মন্তাজেরিকে বাদ দেওয়া হয়। পরে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে খামেনিকে সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত করা হয়।

তাকে নিয়োগ দিতে শীর্ষ এই পদের জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতার শর্ত শিথিল করতে হয়েছিল, কারণ খামেনির কাছে উচ্চপদস্থ শিয়া আলেমদের পদবি ‘হুজতুলইসলাম’ ছিল না। দায়িত্ব নিয়ে তিনি এক ভাষণে বলেছিলেন, “আমি জানি আমি এই পদের যোগ্য নই। এটি বাস্তব নয়, বরং প্রতীকী নেতৃত্ব হবে।”

প্রতীকী নন, প্রকৃত নেতা খামেনি

দায়িত্ব নিয়েই তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠনে মন দেন। ইরান-ইরাক যুদ্ধে ১০ লাখের বেশি মানুষ নিহত ও অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। ইরাকে রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগের পরও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতা ইরানের ক্ষোভ বাড়ায়।

প্রেসিডেন্ট থাকাকালে খামেনি প্রায়ই যুদ্ধক্ষেত্র পরিদর্শনে যেতেন, যা তাকে আইআরজিসির আনুগত্য এনে দেয় এবং যুদ্ধ বাস্তবতা বুঝতে সাহায্য করে। সর্বোচ্চ নেতা হয়ে তিনি সামরিক কাঠামো শক্তিশালী করে ‘শান্তিও না, যুদ্ধও না’–এই নীতিতে চলেন।

শুধু কট্টর ধর্মীয় নেতা নন, প্রয়োজনে বাস্তববাদী সিদ্ধান্ত নিতেও দ্বিধা করতেন না তিনি। ২০১৫ সালে অর্থনৈতিক চাপ ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানিকে বিশ্বশক্তির সঙ্গে পারমাণবিক আলোচনায় অংশ নেওয়ার অনুমতি দেন খামেনি। এর ফলেই ইতিহাস বিখ্যাত ইরান পরমাণু চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

তবে চুক্তির তিন বছর পর প্রথম মেয়াদে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করে নেন এবং নতুন নিষেধাজ্ঞা দেন। এর জেরে খামেনি আবার কঠোর অবস্থানে ফিরে যান ও চুক্তি লঙ্ঘনে সমর্থন দেন।

২০১৯ সালে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার চাপ ও জ্বালানি তেলের দামবৃদ্ধির প্রতিবাদে দেশব্যাপী বিক্ষোভ শুরু হলে নিরাপত্তা বাহিনী কঠোর হাতে তা দমন করে। এতে শতাধিক বিক্ষোভকারী নিহত হয় বলে জানায় অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। বিক্ষোভের পেছনে প্রতিবিপ্লবী ও বিদেশি ‘ইন্ধন’ আছে বলে অভিযোগ করেন খামেনি।

‘প্রতিরোধ অক্ষ’

খামেনির দর্শন ছিল, শুধু সীমান্তে নয়, শত্রুর সম্ভাব্য আক্রমণ প্রতিহত করতে সীমানার বাইরেও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এই ভাবনা থেকেই ইরানের বাইরে সহযোগী দেশ ও গোষ্ঠী নিয়ে ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ গড়ে তোলা হয়। অস্ত্র ও অর্থ দিয়ে সহায়তা করা এই বাহিনী ছিল খামেনির সবচেয়ে প্রভাবশালী কৌশল।

এর প্রধান স্থপতি ছিলেন কুদস বাহিনীর কমান্ডার কাসেম সোলাইমানি, যাকে ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্র হত্যা করে। গাজা যুদ্ধ শুরুর পর এই অক্ষ শক্তিশালী ভূমিকায় দেখা দেয়।

এরই মধ্যে ২০২৫ সালের ১৩ জুন ইসরায়েল ইরানে হামলা চালায়, যাতে যুক্তরাষ্ট্রও জড়িত ছিল বলে জানা যায়। পরে ইরানের কয়েকটি পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালায় তারা। এ যুদ্ধ চলে ১২ দিন।

সর্বশেষ গত ২৮ ডিসেম্বর আবারও বিক্ষোভে উত্তাল হয় ইরান। এ সময় ট্রাম্প বারবার হামলার হুমকি দেন এবং মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করেন। ওমানের মধ্যস্থতায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পরোক্ষ আলোচনা চলছিল। এতে অগ্রগতির খবর এলেও গত শনিবার ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় নিহত হন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি।

দৈনিক বিজয় নিউজ/ মোঃ নাঈম আহমেদ