সংবাদ প্রকাশের জেরে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা, গোপালগঞ্জে তীব্র প্রতিবাদ

সংবাদ প্রকাশের জেরে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা, গোপালগঞ্জে তীব্র প্রতিবাদ
ছবিঃ ফকির মিরাজ আলী শেখ

দৈনিক বিজয় নিউজ বিশেষ প্রতিনিধিঃ

অনিয়মের তদন্ত নয়, সাংবাদিককেই আসামি-মানববন্ধনে ক্ষোভ, মামলা প্রত্যাহার, সড়ক প্রকল্পে দুদকের তদন্ত ও দায়ীদের শাস্তির দাবি। উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম, নিম্নমানের কাজ ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট অভিযোগ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর সাংবাদিকের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা-এ ঘটনাকে স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর চাপ সৃষ্টি এবং গণমাধ্যমকে ভয়ভীতি প্রদর্শনের অপচেষ্টা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন গোপালগঞ্জের সাংবাদিক নেতারা। তারা বলেছেন, উন্নয়নকাজে অনিয়মের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত না করে সংবাদ প্রকাশকারী সাংবাদিককে আইনি হয়রানির মুখে ফেলা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য উদ্বেগজনক বার্তা বহন করে।

এই ঘটনার প্রতিবাদে শনিবার (১১ জুলাই) সকাল ১১টায় গোপালগঞ্জ প্রেসক্লাবের সামনে গোপালগঞ্জ সাংবাদিক ইউনিয়নের উদ্যোগে ঘণ্টাব্যাপী মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এতে জেলার বিভিন্ন প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা অংশ নেন। মানববন্ধনে অবিলম্বে মামলা প্রত্যাহার, সাংবাদিক হয়রানি বন্ধ, সড়ক নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রকৃত দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানানো হয়।

মানববন্ধনে বক্তব্য দেন গোপালগঞ্জ সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি মোঃ সেলিম রেজা, সাধারণ সম্পাদক জয়ন্ত শিরালী, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন, সাংবাদিক পলাশ সিকদার, টুঙ্গিপাড়া প্রেসক্লাবের সভাপতি আফজাল হোসেন, কোটালীপাড়া সাংবাদিক ফোরামের সহসভাপতি কামরুল হাসান চান মিয়া সিকদারসহ আরও অনেকে।

বক্তারা বলেন, একজন সাংবাদিকের দায়িত্ব হলো জনগণের অর্থে বাস্তবায়িত উন্নয়ন প্রকল্পের কাজের মান, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে তথ্যভিত্তিক সংবাদ প্রকাশ করা। কিন্তু অনিয়মের অভিযোগ তদন্তের পরিবর্তে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের ঘটনা শুধু একজন সাংবাদিক নয়, গোটা গণমাধ্যম অঙ্গনের জন্য উদ্বেগের বিষয়।

তারা বলেন, যদি কোনো সংবাদে ভুল থাকে, তাহলে আইনি ও তথ্যভিত্তিক প্রতিকারের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সংবাদ প্রকাশের পরপরই চাঁদাবাজির মতো গুরুতর অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করা স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশকে সংকুচিত করতে পারে। এ ধরনের প্রবণতা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্য নেতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।

গত ৬ জুলাই আমার দেশ অনলাইনে কোটালীপাড়ায় সড়ক নির্মাণে অনিয়ম, কার্পেটিং উঠে যাওয়ার ভিডিও ভাইরাল শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সেখানে স্থানীয়দের অভিযোগ, ছবি ও ভিডিওর ভিত্তিতে দাবি করা হয় যে, কাজ শেষ হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই সড়কের কার্পেটিং হাতের স্পর্শেই উঠে যেতে শুরু করে এবং বিভিন্ন স্থানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এর পরদিন ৭ জুলাই গোপালগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দৈনিক আমার দেশ-এর সাংবাদিক, গোপালগঞ্জ সাংবাদিক ইউনিয়নের সদস্য ও কোটালীপাড়া সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি মনিরুজ্জামান শেখ জুয়েলের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা দায়ের করেন জাকাউল্লাহ অ্যান্ড ব্রাদার্স লিমিটেডের স্থানীয় প্রতিনিধি ইয়াসিন হোসেন।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) গুরুত্বপূর্ণ পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প (দ্বিতীয় পর্যায়)-এর আওতায় ৭৪ লাখ ৬৭ হাজার ৩০১ টাকা ব্যয়ে ১ হাজার ২৬৫ মিটার দীর্ঘ শিকিরবাজার স্কাউট ভবন থেকে পূর্ব চিত্রাপাড়া পর্যন্ত সড়কের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পায় চুয়াডাঙ্গাভিত্তিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জাকাউল্লাহ অ্যান্ড ব্রাদার্স লিমিটেড।

স্থানীয়দের অভিযোগ, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের কারণে কাজ শেষ হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই কার্পেটিং উঠে যেতে শুরু করে এবং বিভিন্ন স্থানে সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও জনমনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, জাকাউল্লাহ অ্যান্ড ব্রাদার্স লিমিটেডের স্থানীয় প্রতিনিধি ইয়াসিন হোসেনের তত্ত্বাবধানে গোপালগঞ্জ জেলার বিভিন্ন সড়ক নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজের মান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগ রয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে আলোচনা আছে। তাই পুরো বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), এলজিইডি এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের মাধ্যমে কারিগরি ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে সত্য উদঘাটনের দাবি জানান তারা।

বক্তারা বলেন, জনগণের অর্থে বাস্তবায়িত উন্নয়ন প্রকল্পে কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতি থাকলে তা উদঘাটন এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একই সঙ্গে কোনো সাংবাদিককে পেশাগত দায়িত্ব পালনের কারণে হয়রানির শিকার হতে দেওয়া যাবে না।

মানববন্ধন শেষে সাংবাদিক নেতারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, মামলা প্রত্যাহার এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া না হলে বৃহত্তর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। তারা স্বাধীন সাংবাদিকতা, জবাবদিহিমূলক উন্নয়ন এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সংশ্লিষ্ট সব মহলের কার্যকর উদ্যোগ কামনা করেন।

দৈনিক বিজয় নিউজ/ ফকির মিরাজ আলী শেখ