শিক্ষক নিগৃহিত ও লাঞ্চিত ; এই দায় কার?
দৈনিক বিজয় নিউজ কুমিল্লা প্রতিনিধিঃ
বাংলাদেশে চলমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের পটপরিবর্তনের সাথে সাথে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে শিক্ষার্থীদের হাতে গণহারে শুরু হয়েছে শিক্ষক নিগৃহিতের এক মহোৎসব। যা এমন ধারাবাহিকভাবে চলমান থাকলে দেশ, সমাজ এমন কি মানব সভ্যতাও ভবিষ্যতে হুমকীর মুখে পড়বে। যাতে করে জাতি উপকৃত নয়, বরং দ্রুত ধ্বংসের দিকে ধাবিত হবে। এ থেকে জাতিকে রক্ষা করা কোন উপায়ে সম্ভব হবে না। এই অবস্থা চলমান থাকলে একটা সময় কোন সুস্থ মানুষ শিক্ষকতার মতো মহান আর মহৎ পেশায় আসবে না। তখন জাতির জন্য হিতে বিপরীত হবে। দেশে সত্যিকারের মেধাবী ও সভ্য মানুষের পরিবর্তে অসভ্য ও বর্বর তৈরি হবে। তবে ইতিমধ্যে আমরা তার কিংচিৎ প্রমাণ পেয়ে গেছি। আর তখন তারা না বুঝবে পরিবার ব্যবস্থা, না বুঝবে সমাজ কিংবা রাষ্ট্র চিন্তা! তখন দেশের ক্ষমতার মসনদে বসে থাকা মানুষগুলো যা বলবে তারা সেই কথা অবনত মস্তকে মনে চলবে। ইতিহাস তেমনি বলে, হয়ত আমরা সেই ইতিহাসের খোজ রাখি না কিংবা বেমালুম ভুলে গেছি। তবে এটাই চিরন্তন সত্য।
অনেকে বলছেন, খুব শিগ্রই এর বিচার হবে! আমি বলি, কে করবে কার বিচার? বিষয়টা হাস্যকর নয় কি? আর এদিকে যে একজন সম্মানীত শিক্ষাগুরুর অর্জন ব্যক্তি ও পারিবারিক সম্মান ধুলোয় মিশে গেলো তার প্রতিদান কি হবে। কোর্টকাচারি এর বিনিময় কি দিবে? এই জাতি আগামীতে কি পাবে একবার চিন্তা করে বলুন! এসব আবেগ দিয়ে কারো সম্মান পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। তবে হা খারাপ কিছু শিক্ষকও আছে কিন্তু তাদের কোন সমস্যা হচ্ছে না, তারা নিজের চেয়ারে বহাল তবিয়তে বসে আছে। সমস্যা হচ্ছে মেধা সম্পন্ন শিক্ষকদের, যারা একজন ছাত্রকে মানুষ হওয়ার তাগাদা করে। এর বিনিময় কি দিবেন? লজ্জা এই জাতির জন্য।
আমরা দেখতেছি যে যেখানে হত দুই প্রজন্ম ধরে বাবা-মা’কে বৃদ্ধাশ্রমে রাখার প্রচলন শুরু হয়েছে। অসম্মান, অবহেলায় বয়বৃদ্ধদের তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করার মত স্পর্ধা দেখানোর সাহস সঞ্চার করছে। সেই প্রজন্মের পরবর্তি একটি প্রজন্ম আজ বাংলাদেশে একটি রাজনীতিক পটপরিবর্তনের সাথে সাথে হিংস্র হায়েনার মতো জাপিয়ে পড়েছে সেই মানুষগুলোর উপর যারা বর্ণ থেকে শব্দ, লাইন থেকে পৃষ্ঠা হাতে ধরে জ্ঞান দান করেছে। আবার তারা নিজেদের দাবি করে দেশ সেরা মেধাবী হিসাবে। সত্যি এসব মেধাবীদের জন্য একটা সময় সমগ্র জাতি পস্তাবে। হয়ত তখন আর কিছু করার থাকবে না, শুধু মাথা চাপরানো ছাড়া। আজ তারা বাবা-মা, শিক্ষক কাউকে সম্মান করতে শিখতেছে না, তাহলে তারা কোন মুখে সম্মানের দাবি করবে বা করে। তাদের পরবর্তী প্রজন্ম কিভাবে শিক্ষকের মর্যাদা শিখবে? কে শিখাবে তাদের নম্রতা, ভদ্রতা, মান্যতা ও সভ্যতা? আর কে গড়ে তুলবে এই সব বন্যদের মানুষ রুপে। একজন মানুষের মাঝে যখন শিক্ষার আলো যথাযথভাবে প্রবেশ করতে না পারে। তখন সে দেখতে মানুষের আকৃতি থাকলেও আদতে মানুষ নয়,কিংবা মানুষ হতে পারে না।
আমরা জানি শিশুরা যেই পরিবেশে বড় হয়ে ওঠে, তাদের আচারণেও তার প্রতিচ্ছবি প্রকাশ পায়। বর্তমানে একজন ছাত্র যেভাবে একজন শিক্ষকের গাঁয়ে তোলার সাহস তৈরি করেছে এবং শিক্ষকদের গায়ে হাত উঠানোর মত ভয়ংকর সাহস দেখাচ্ছে, এই অপরাধের দায় কি তাদের পরিবারের নয়? একজন পিতা-মাতা কি এর দায় এড়াতে পারেন? না পারেন না, কারণ তাদের শিক্ষাই আজ তার সন্তান এমন ঘৃণ্য আর জঘণ্য কাজ করেত দ্বিধাবোধ করেনি। এই ক্ষেত্রে একজন ছাত্রের পাশাপাশি একজন পিতা-মাতাও সমান অপরাধী।
অন্যদিকে যে শিক্ষকরা এতদিন এই ছাত্রদের শিক্ষা প্রদান করেছেন এই দায় কি তারাও এড়াতে পারবে? না তারাও এড়িয়ে যেতে পারেন না। একজন শিক্ষক শুধু মাত্র ছাত্রকে একটি পড়ার বই মুখস্ত করিয়ে পরিক্ষায় ভাল রেজাল্ট করিয়ে নিজেকে মহা দায়িত্ববান হিসাবে উপস্থাণ করে চলে যাবে এটা হতে পারে না। তাদের উচিত সর্বাবস্থায় একটা ছাত্রকে মার্জিত আচার-আচরণ শিক্ষা দেয়া আর যদি সেটা শিখাতে না পারলেন, তাহলে শুধু দিস্তায় দিস্তায় বই মুখস্ত করানোর অর্থ কি? একি শুধু সভ্য জাতিকে অসভ্য করে তোলার পায়তারা নয়?
ভুলে গেলে চলবে না আজ শিক্ষকদের সাথে যেই আচরণ হচ্ছে তার ই প্রেক্ষিতে আমাদের সামনে ভয়ংকর রূপের এক জেনারেশন আসতেছে যার ফলাফল বাবা-মা থেকে শুরু করে সমাজ, রাষ্ট্র এমন কি বিশ্ব সভ্যতাও ভোগ করতে হবে। আমরা ছোটবেলা থেকে জেনে এসেছি, ”জাতির মেরুদন্ড শিক্ষা, আর শিক্ষার মেরুদন্ড শিক্ষক।”
তবে এই সময় দাড়িয়ে আমরা সেই মহৎ বাণীটি কেমন জানি বেমালুম ভুলে গেছি! না এটা ভুলে গেলে আমাদের চলবে না! যাদের জন্য আজকে আমাদের দেশের সম্পদ শিক্ষকরা লাঞ্ছিত হচ্ছে! এর বিচার কার কাছে দেবো? কে করবে এর সঠিক সূরাহা।
বর্তমানে যারা দেশের দায়িত্বভার গ্রহণ করে দেশ পরিচালনা করছেন, তারা নাকি বাকস্বাধীনতায় বিশ্বাসী-কিন্তু কতটা বাক স্বাধীনতায় বিশ্বাসী তা তাদের উদ্ধাত্যপূর্ণ কথা আর আচরণ দেখে বুঝা যায়। তবে আমি আজকের এই লেখায় তাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ কিংবা কথা বলবো না। আমার কথা হচ্ছে দেশের শাসনভার গ্রহণ করেছেন একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন শিক্ষক এটা খুব সুখকর একটি বিষয়। তবে আফসোস হচ্ছে সেই শিক্ষককের শাষিত দেশে কি করে অন্য একজন সুদক্ষ ও মেধাবী শিক্ষক লাঞ্চিত এবং অপমানিত হয়। তাহলে তিনি কেমন শিক্ষক? যে নিজের পথের সহযোদ্ধাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। বিষয়টি চিন্তারও বটে!
দেশে চলমান পরিস্থিতিতে শিক্ষকরা অপমানিত ও লাঞ্চিত হওয়ার জন্য আমি কিছু কারণ খুজে পেয়েছি। যা আমাদের দেশের আগামী প্রজন্ম ও দেশবাসীর জন্য অশনি সংকেত বলে মনে করি। যেসব কারণে শিক্ষকরা নিগৃহের শিকার গচ্ছে :
১/ সঠিক মূল্যবোধ সম্পন্ন পারিবারিক শিক্ষার অভাব
২/ শিক্ষাঙ্গণে ছাত্রদের অপরাজনীতির চর্চা
৩/ রাজনীতির উঠতি নেতাদের সাথে মিশে নৈতিক অবক্ষয়
৪/ একজন সুদক্ষ শিক্ষককের ছাত্রের প্রতি উদাসীনতা
৫/ ছাত্রদের শাষনের ক্ষেত্রে শিক্ষকদের বেত নিষিদ্ধকরণ
৬/ অনলাইন ব্যবহার ও সামাজিক মাধ্যমের সহজলভ্যতা
৭/ সামাজিক মাধ্যমসমূহে উষ্কানী ও গুজবের ছড়াছড়ি
৮/ রাজনীতির নামে সহজ শর্তে অপরিমান্য অর্থ লাভ
৯/ পিতামাতার উদাসীনতার জন্য অসৎ বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গ
১০/ পারিবারিক ও শিক্ষার মূল্যবোধহীনতা।
দৈনিক বিজয় নিউজ/ মোঃ আবদুল্লাহ