"ভারত, যাদের শত্রু পাকিস্তান, তুরস্ক ও চীন"

ছবিঃ সংগৃহিত

দৈনিক বিজয় নিউজ বিশেষ প্রতিনিধিঃ

নয়াদিল্লি যখন অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত পুনর্গঠনে ব্যস্ত, ঠিক তখনই সমুদ্রপথে তার নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেঙে দেওয়ার মতো একটি অদৃশ্য হুমকি মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। আগামী এক থেকে দুই দশকের মধ্যে এই চ্যালেঞ্জ বাস্তব রূপ নিতে পারে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ২০৪০ সালের মধ্যে ভারতকে একটি সমন্বিত সামুদ্রিক জোটের মুখোমুখি হতে হতে পারে—যার নেতৃত্বে থাকবে চীন, তুরস্ক ও পাকিস্তান। এই তিন দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সামরিক জোটে আবদ্ধ না থাকলেও, সামরিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার দিক থেকে তাদের সম্পর্ক এতটাই ঘনিষ্ঠ যে, একে একটি 'ডি-ফ্যাক্টো নৌ জোট' বললে অত্যুক্তি হবে না।

অপারেশন সিদুঁর ও বহুপাক্ষিক চাপ

সম্প্রতি ভারতের 'অপারেশন সিদুঁর'-এর সময় এই জোটের সম্ভাব্য ভূমিকা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভারত সরকার এই মহড়াকে একটি 'প্রতিরক্ষা অনুশীলন' বলে বর্ণনা করলেও, এটি ছিল ভারতীয় নৌ, স্থল, বিমান, সাইবার ও মহাকাশ বাহিনীর সমন্বয়ে পরিচালিত একটি ব্যাপক যুদ্ধ-অভিযান। ভারত দাবি করে, এটি মূলত একটি একক অভিযান ছিল। তবে, পাকিস্তানের সমর্থনে তুরস্ক ও চীনের পরোক্ষ উপস্থিতিও এই সময়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

ভারত নিজেকে আঞ্চলিক পরাশক্তি হিসেবে দেখতে পছন্দ করে এবং সে অনুযায়ী আচরণও করে। কিন্তু ভবিষ্যতে প্রতিটি যুদ্ধে তাকে একাই লড়তে হতে পারে, অন্যদিকে প্রতিপক্ষ হবে সুসংগঠিত ও বহুজাতিক। এই অসমতা শুধু সামরিক ভারসাম্যই নয়, কূটনৈতিক কৌশল ও বৈশ্বিক অবস্থানকেও দুর্বল করে দিতে পারে।

চীন-তুরস্ক-পাকিস্তানের নৌশক্তি: ২০৪০ সালের সম্ভাব্য চিত্র

চীনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৪০ সালের মধ্যে তাদের নৌবাহিনীতে থাকবে:

  • ৬টি বিমানবাহী রণতরী

  • ১২টি পরমাণু হামলাসক্ষম ডুবোজাহাজ

  • ৬০টিরও বেশি প্রচলিত ও এআইপি (এয়ার-ইন্ডিপেন্ডেন্ট প্রপালশন) ডুবোজাহাজ

  • ১৫০টির বেশি যুদ্ধজাহাজ

এআইপি প্রযুক্তিসম্পন্ন ডুবোজাহাজগুলি সাধারণ ডিজেল-ইঞ্জিনচালিত ডুবোজাহাজের চেয়ে অনেক বেশি সময় পানির নিচে থাকতে পারে (২-৩ সপ্তাহ)। এছাড়াও, চীন বেইদু উপগ্রহ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে গোয়েন্দা নজরদারির ক্ষমতা এমন স্তরে নিয়ে গেছে যে, পাকিস্তানের গোয়াদার বন্দরের মতো বাণিজ্যিক স্থাপনাও এখন কার্যত একটি সামরিক ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে। শুধু দক্ষিণ চীন সাগর নয়, আফ্রিকার জিবুতি, ভারত মহাসাগরের দ্বীপপুঞ্জ এবং মালাক্কা প্রণালীতেও চীনের প্রভাব ক্রমশ বাড়ছে।

অন্যদিকে, তুরস্ক নিজের নৌশক্তিকে আধুনিকায়নে ব্যস্ত। তাদের মিলজেম প্রকল্পের অধীনে নির্মিত হচ্ছে:

  • টিএফ-২০০০ ক্লাস ডেস্ট্রয়ার

  • স্টেলথ ডুবোজাহাজ

  • স্বদেশী বিমানবাহী রণতরী

এসবের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে সশস্ত্র ড্রোন, রোবট-ডুবোজাহাজ ও এআই-চালিত নজরদারি প্রযুক্তি—যা পাকিস্তানের সঙ্গেও ভাগ করে নিচ্ছে তুরস্ক। পাকিস্তান ইতিমধ্যেই তুর্কি নির্মিত বাবর-ক্লাস কর্ভেট এবং চীনের টাইপ ০৫৪এ/পি ফ্রিগেট ও হ্যাংগর-ক্লাস এআইপি ডুবোজাহাজ পেয়েছে। ফলে, ভারতের ধারণা, পাকিস্তান এখন সমুদ্রভিত্তিক পরমাণু প্রতিরোধ ক্ষমতা (Sea-Based Nuclear Deterrence) গড়ে তুলছে, যার প্রতীক হলো বাবর-৩ ডুবোজাহাজ থেকে নিক্ষেপযোগ্য পরমাণু ক্ষেপণাস্ত্র

ত্রিমুখী হুমকি: ভারতের আশঙ্কা

২০৪০ সাল নাগাদ এই তিন দেশ মিলে গড়ে তুলতে পারে একটি শক্তিশালী নৌজোট, যার সামরিক শক্তি অন্তর্ভুক্ত করবে:

  • ৮০টিরও বেশি ডুবোজাহাজ

  • ৭টি বিমানবাহী রণতরী

  • ২০০টির বেশি যুদ্ধজাহাজ

এদের সক্ষমতার মধ্যে থাকবে বহুস্তরীয় ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ইন্টিগ্রেটেড কমব্যাট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, রিয়েল-টাইম গোয়েন্দা নজরদারি (ISR) এবং উপগ্রহ-সংযুক্ত নেভিগেশন।

ভারতের আশঙ্কা, এই জোট তিনটি ভিন্ন ভৌগোলিক অঞ্চল থেকে চাপ তৈরি করতে পারে:

  • চীন: দক্ষিণ চীন সাগর ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে

  • তুরস্ক: লোহিত সাগর ও পূর্ব মধ্যপ্রাচ্য থেকে

  • পাকিস্তান: আরব সাগর থেকে

ভারতের প্রস্তুতি: কী প্রয়োজন?

বর্তমানে ভারতের নৌবাহিনীতে ২৪টি ডুবোজাহাজ থাকলেও সেগুলো চীনের আধুনিক ডুবোজাহাজ বহরের তুলনায় দুর্বল। বিশেষ করে, চীনের এআইপি ও পরমাণু-সক্ষম ডুবোজাহাজ ভারতের অরিহন্ত-শ্রেণির এসএসবিএন-এর টহল ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে।

২০৪০ সালের মধ্যে ভারতে একটি শক্তিশালী নৌশক্তি গড়ে তুলতে প্রয়োজন:

  1. আইএনএস বিশাল-এর মতো বিমানবাহী রণতরীর নির্মাণ ত্বরান্বিত করা।

  2. প্রকল্প এসএসএন-এর অধীনে ৬টি পরমাণু-সক্ষম ডুবোজাহাজ দ্রুত অন্তর্ভুক্ত করা।

  3. প্রকল্প ৭৫আই-এর অধীনে এআইপি ডুবোজাহাজ তৈরির গতি বাড়ানো।

  4. আন্দামান ও নিকোবর ঘাঁটিকে আক্রমণ-সক্ষম করে তোলা।

  5. ভিয়েতনাম, ওমান ও রেউনিয়ন-এর মতো কৌশলগত অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি জোরদার করা।

  6. দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি সোনার, টর্পেডো, ইউসিএভি ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সরঞ্জাম মোতায়েন করা।

এই পদক্ষেপগুলি না নিলে, ২০৩৫-৩৭ সালের মধ্যে ২০০টি যুদ্ধজাহাজ, ৩টি ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ ও ৫০০টি নৌবিমান অর্জনের লক্ষ্য শুধু স্বপ্নই থেকে যাবে। আর যদি ভারত প্রস্তুত না থাকে, তাহলে এই তিন দেশের নৌজোট সমুদ্রের নিচে ভারতের কৌশলগত অবস্থানকে ধ্বংস করে দিতে পারে—এটাই এখন নয়াদিল্লির সবচেয়ে বড় আশঙ্কা।

দৈনিক বিজয় নিউজ/ এমই