৬৭ দিনের পুষ্প (এস এম মনিরুজ্জামান আকাশ)

৬৭ দিনের পুষ্প (এস এম মনিরুজ্জামান আকাশ)
ছবি: এস এম এম আকাশ

 দৈনিক বিজয় নিউজ পাবনা প্রতিনিধিঃ

সজীব পাবনা জেলার চলনবিল অধ্যুষিত প্রত্যান্ত এক গ্রামের সাধারণ একজন সাংস্কৃতি মনা কিশোর।ডানপিটে স্বভাবের কারণে সারাদিন যত্র তত্র ঘুরে বেড়ায়। মাঝে মধ্যে স্কুল ফাঁকি দিয়েও ঘুরে বেড়ায়। তবে কিশোর বয়স থেকে বেতার অন্তপ্রান হিসেবে এলাকার লোকজনের নিকট সুপরিচিত। ২০০৮ সালের দিকের কথা, বাংলাদেশ বেতারের বিভিন্ন কেন্দ্রের অনুরোধের আসর, চিঠি পত্রের জবাবের আসর গুলোতে নিয়মিত লিখতে ভালোবাসে সজীব। বহিঃবিশ্বের বেতার প্রোগ্রাম গুলোর মধ্যে ভয়েজ অব আমিরিকা, বিবিসি, রেডিও তেহরান,সিআর আই,রেডিও ভেরিতাস এশিয়া, এনএইচকে,ডয়চে ভেলে সহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বেতার প্রোগ্রাম শোনে ও লিখে থাকে। বেতার শোনা ও বেতারে লেখালেখির সুবাদে পাবনা জেলার বাসিন্দা হওয়ার প্রেক্ষিতে সারা বাংলাদেশে বিভিন্ন জেলায় বেতার লিখিয়ে শ্রোতা বন্ধুদের সাথে গভীর সম্পর্ক গড়ে উঠে। পত্র চালাচালি, উপহার আদান প্রদান সহ মনের গহীনে চাপা, জমে থাকা কথা মালা প্রকাশ করা এক অসম্ভব ব্যপারকে বাস্তবে রুপ ভাষা দানের প্রয়াস!

সজীবের বেতার জীবনে সবচেয়ে বেশি বন্ধু বান্ধবের সাথে সম্পর্ক তৈরি হয় মাগুড়া জেলার বেতার শ্রোতাদের সাথে। মাগুড়া জেলার বেতার অন্তপ্রান লেখক শ্রোতারা সজীবের সজীবতায় মুগ্ধ হয়ে হৃদয়ে দাগ কেটে বসে। অসংখ্যজনের সাথে চিঠি পত্রের আদান প্রদান সজীবকে পরিনত করে তোলে। না দেখা বেতার অঙ্গনে সজীবের হৃদয়ের বহুলাংশ জুড়ে রয়েছে মাগুড়া জেলার মুহাম্মদপুর উপজেলা ও উপজেলার বেতার লিখিয়ে শ্রোতাগন। মাগুড়া মুহাম্মদপুরের পঞ্চমী খ্যাত পাঁচ বান্ধবীর নিয়মিত পত্রালাপ সজীবকে করেছে প্রকৃতির সাথে সাথে বাস্তবতায়ও প্রেমিক। পাঁচ বান্ধবী হোস্টেল জীবনে থাকতে গিয়ে তাদের এক জুনিয়র শিক্ষার্থী(শ্রাবণী পুষ্প)ফোন নং দেয় সজীব কে। কথা হয় সজীবের বেতার বান্ধবীদের সাথে সেই পুষ্পের নম্বরে বেতার বান্ধবীদের সাথে।
২০০৮ সালের পাঁচ সেপ্টেম্বর রাতে সজীব পুষ্পকে কল করে বেতার বান্ধবীদের সাথে কথা বলতে ইচ্ছে পোষণ করলে বাঁধে বিপত্তি। পুষ্প শ্রাবণীর সাথে মোবাইলে কথা বলতে বলতে এক পর্যায়ে অনুরাগের বীজ বোপিত হয়ে যায়। প্রায় ঘন্টাধিক কাল বিতর্ক চলে সজীব পুষ্পের মাঝে।

গভীর রাত উতলা উচাটন মন বিষন্নতা হারায়! ভাবনার মাঝেই ঘুমিয়ে পড়ে সজীব। হয়তো শ্রাবণী পুষ্পও সারা রাত ছটফট করে কাটিয়েছে। পরদিন যথারীতি সজীব তার কাজকর্মে ব্যস্ত সময় পার করছে। হঠাৎ করেই নোকিয়া ১১০০ মডেলের মোবাইল ফোনে রিংটোন বেজে ওঠে। রিসিভ করে সজীব শুনতে পায় শ্রাবনী পুষ্প'র কন্ঠস্বর! সারাদিনে কয়েক বার কথা বলে তারা একে-অপরের সাথে। চলতে থাকে সময়ের কাটা, মিনিট, ঘন্টা,দিন, সপ্তাহ, মাস। উভয়ই উভয়ের প্রতি অমোঘ আকর্ষণ বোধে বাঁধা পড়ে গেছে। শ্রাবণী পুষ্প সজীবের সাথে মুহূর্তে মুহূর্তেই কথা বলার জন্য পাগল হয়ে যায়। সজীব কে বাসায় দাওয়াত করে ও পুষ্প তার বাবার আদরের সন্তান হওয়ায় সজীবের সম্পর্ক সহজেই মেনে নেবে বলে জানায়। সজীবের সাথে পুষ্প তার কাজিন তানিয়া সুলতানাকে মোবাইলে আলাপ করিয়ে দেয়। পাবনা থেকে কাজে অনেক লেবার(কামলা) শ্রাবনীদের বাড়ীতে কাজ করতে যান শ্রাবণী তাদের সাথে অসম্ভব সুন্দর ব্যবহার করে সজীবের বাড়ী পাবনা এজন্য।

সজীবকে শ্রাবনী বলে যে, আপনি আমাদের বাড়ীতে আসবেন, আব্বা ও ভাইয়া জিজ্ঞেস করলে বলবেন যে, আপনাদের বাড়ীতে পাবনা থেকে যারা কাজ করে গেছেন তারা আমার পরিচিত জন। আমি শ্রাবণীকে দেখতে এসেছি, আমি শ্রাবনীর জন্য উপযুক্ত পাত্র। এভাবে শ্রাবণী সজীবকে শ্রাবণীর প্রতি আসক্ত করে ফেলে। প্রতিদিন তারা কথা বলতে বলতে নিবিড়তাকেও হার মানায়! প্রতিরাতে মোবাইলে যতক্ষণ চার্জ থাকে ততক্ষণ কথা বলতে থাকে। কোন কোন রাত কথা বলতে বলতে ভোর হয়ে যেতো। চলতে থাকে এভাবেই মধুময় দিন। দুই মাস পার হয়ে যায়। সম্পর্ক আপনি থেকে তুমিতে গড়াগড়ি খায়। শ্রাবনী সজীবকে বলে তোমাদের বাড়ীতে প্রাইভেট কার নিয়ে যাওয়া যাবে কি! সজীব উত্তরে বলে জ্বি অবশ্যই আসা যাবে, আমার বাড়ীর আঙ্গিনা থেকে পাকা রাস্তা চল্লিশ মিটার দুরে। চলতে থাকে মুহাম্মদপুর মাগুড়া থেকে পাবনা আসার পরিকল্পনা। শ্রাবণীর পিতা, ভাই-ভাবী ও শ্রাবনী আসবে সজীবের সাথে ও সজীবের পরিবারের লোকজনের সাথে সাক্ষাৎ করতে। মহা খুশিতে দুটি প্রান মিলনের পূত ও পবিত্র বারতায় উদ্বেলিত! শ্রাবনী আসতে ইচ্ছুক, সজীব শ্রাবনীকে বলে যে, তুমি আসার দরকার নেই বিয়ের আগে। গ্রামের লোকেরা হয়তো এটা সেটা ভাববে বা মনে করবে।

২০০৮ সালের দশ নভেম্বর রাত দশটা, শ্রাবণী কল করে কথা বলতে চায়, সজীবও সায় দিয়ে কথা শুরু করে, আধা ঘণ্টা কথা হয় ঝাঁঝালো কণ্ঠে। একে অপরের সাথে উত্তেজিত মেজাজে কথা বলতে বলতে পঁচা পুঁটি মাছ নই আমি এই কথা বলে শ্রাবনী পুষ্প নিজেকে সজীবের চেয়ে সব দিক দিয়ে অধিক যোগ্য, সজীব তার যথাযথ উপযুক্ত নয়, মন মানসিকতার দিক থেকে এমনকি সকল দিক থেকে। সজীব সহজেই শ্রাবনী পুষ্পকে বলে তুমি আমার অধিক প্রিয় একজন মানুষ। তোমাকে আমি ৬৭ দিন লালন করেছি, আমার বুকে তোমাকে ভালোবাসি বলে আমি তোমাকে কিছুই বলবোনা! যাকে ভালোবাসা যায়, তাকে কিচ্ছু বলা যায় না, বলা উচিৎ নয়! তুমি ভালো থেকো, তোমার ভাবনায়, হয়তো কথা হবে কিনা আর কোন দিন? তবে তোমাকে বাঁচিয়ে রাখবো আমার কবিতা-গানে, লিখনীতে আমার মুক্ত ভাবনার প্রতিবিম্বে! ভালো থেকো, সুখী হও! আমার কাব্য মানসপটের ৬৭ দিনের পুষ্প !

দৈনিক বিজয় নিউজ/ এস এম এম আকাশ