খুন, চুরি ও কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্যে থমথমে কুমিল্লা: আতঙ্কিত নগরবাসী
দৈনিক বিজয় নিউজ বিশেষ প্রতিনিধি:
সাম্প্রতিক সময়ে খুন, চুরি, ডাকাতি, মাদক ব্যবসা, অপহরণ ও ছিনতাইয়ের অভৃদ্ধিতে চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন কুমিল্লার সাধারণ মানুষ। জেলাজুড়ে অপরাধের এই লাগামহীন দৌরাত্ম্যে জনমনে তীব্র অসন্তোষ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। বিশেষ করে নগরীর অলিগলি থেকে শুরু করে জেলার বিভিন্ন প্রান্তে কিশোর গ্যাং ও ছিনতাইকারীদের বেপরোয়া তৎপরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। অপরাধ চিত্রের ভয়াবহতাসমূহ জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের গত জুলাই মাস পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন এলাকায় ৯৩টি হত্যাকাণ্ডের মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়:
ডিসেম্বর: ৯টি
জানুয়ারি: ১৪টি
ফেব্রুয়ারি: ১২টি
মার্চ: ৯টি
এপ্রিল: ১৬টি
মে: ৭টি
জুন: ১০টি
জুলাই: ১০টি
এছাড়া একই সময়সীমায় ২২টি ধর্ষণের ঘটনাও রেকর্ড করা হয়েছে। গত ছয় মাসের পরিসংখ্যানে আরও রয়েছে ৩৩৩টি চুরি, ৩৫টি ডাকাতি এবং ১৪টি অপহরণের ঘটনা। নগরীতে বেড়েছে চুরি ও ছিনতাইয়ের উৎপাত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নানা উদ্যোগের কথা বলা হলেও, সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের অভিজ্ঞতা ভিন্ন কথা বলছে। অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বর্তমানে কুমিল্লা নগরীতে চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় শহরজুড়ে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। গত ১৩ আগস্ট বিকেলে নগরীর পুরাতন চৌধুরীপাড়া এলাকা থেকে মরহুম মোখলেসুর রহমানের ছেলের একটি মোটরসাইকেল চুরি হয়ে যায়। একই রাতে নগরীর কালিয়াজুড়ী এলাকার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী বারাতের ছেলের বাইসাইকেল চুরির ঘটনা ঘটে। এছাড়া পাক্কা মাথা সংলগ্ন কোড়েরপাড় এলাকায় রাতের আঁধারে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে নিয়মিত বৈদ্যুতিক তার চুরির উপদ্রব চলছে।
কিশোর গ্যাং ও আইনি জটিলতা নগরীর বিভিন্ন স্কুল-কলেজকেন্দ্রিক এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের সরব উপস্থিতি রয়েছে। পুলিশ প্রশাসন নিয়মিত অভিযান চালালেও তাদের দৌরাত্ম্য পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে কুমিল্লা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পিপি অ্যাডভোকেট কাইমুল হক রিংকু জানান, কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধ দমনে আসামিদের বয়স নির্ধারণ একটি বড় আইনি জটিলতা তৈরি করে। অনেক ক্ষেত্রে স্কুল সার্টিফিকেটে বয়স বেশি দেখানো কিংবা বয়স গোপন করার প্রবণতা দেখা যায়, যা দমনে আইনি প্রক্রিয়াকে শ্লথ করে দেয়। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের আরও বেশি সতর্ক হওয়ার তাগিদ দেন তিনি।
পুলিশের অবস্থান ও করণীয় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত ও জোরদার অভিযান পরিচালনার কথা জানানো হয়েছে। গত মাসে এককভাবে ১৯২ জন ছিনতাইকারীকে আটকের তথ্য জানিয়েছে জেলা পুলিশ। অপরাধের পেছনে মাদক, বেকারত্ব, কিশোরদের বিপথগামিতা এবং সামাজিক অবক্ষয়কে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্লেষকদের মতে, কেবল পুলিশি অভিযান দিয়ে এই সামাজিক ব্যাধি পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপের পাশাপাশি পরিবারের তদারকি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নৈতিক শিক্ষা এবং সামাজিক সংগঠন ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই কেবল কুমিল্লার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব।
দৈনিক বিজয় নিউজ/ সুমন আহমেদ