আজানের সুরে ঢেকে রাখা এক জীবনের কান্না—গলাচিপা হাসপাতাল মসজিদের মোয়াজ্জেমের আকুল আবেদন,

আজানের সুরে ঢেকে রাখা এক জীবনের কান্না—গলাচিপা হাসপাতাল মসজিদের মোয়াজ্জেমের আকুল আবেদন,
ছবিঃ নাসির উদ্দিন

দৈনিক বিজয় নিউজ গলাচিপা উপজেলা প্রতিনিধি:

প্রতিদিন ভোরের নিস্তব্ধতা ভেঙে যখন গলাচিপা উপজেলা সরকারি হাসপাতাল জামে মসজিদ থেকে ভেসে আসে আজানের সুমধুর ধ্বনি, তখন অনেকেই নতুন দিনের আশায় বুক বাঁধেন। কিন্তু সেই আজানের পেছনের কণ্ঠে লুকিয়ে আছে এক গভীর বেদনা, এক অনুচ্চারিত কান্না—যার নাম হাফেজ মোঃ ফারুক। দীর্ঘ ১০ বছর ধরে এই মসজিদে মোয়াজ্জেম ও খাদেম হিসেবে নিরলস ভাবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন তিনি। দিন-রাত, সুখ-দুঃখ, ঝড়-বৃষ্টি—কোনো কিছুই তাকে থামাতে পারেনি আল্লাহর ঘরের সেবায়। কিন্তু এই নিবেদনের বিনিময়ে তার প্রাপ্তি খুবই সামান্য—একটি সীমিত আয়, যা দিয়ে চলছে না তার জীবনের কঠিন সমীকরণ।

গলাচিপা পৌরসভার শান্তিবাগ এলাকার ৩ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা, প্রয়াত আব্দুল বারী মিয়ার সন্তান হাফেজ মোঃ ফারুক। তার সংসারে আছেন বৃদ্ধ মা, স্ত্রী ও দুই সন্তান। বড় ছেলেকে মাদ্রাসায় পড়াশোনা করানোর স্বপ্ন নিয়ে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করছেন তিনি। কিন্তু সেই স্বপ্ন যেন প্রতিদিনই দারিদ্র্যের কঠিন বাস্তবতায় থমকে যাচ্ছে। কথা বলতে গিয়ে বারবার থেমে যাচ্ছিলেন তিনি। চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু যেন কথার আগেই সব বলে দিচ্ছিল— “ভাই, এই সামান্য টাকায় সংসার চালানো সত্যিই অসম্ভব হয়ে যাচ্ছে। অনেক সময় ঠিকমতো খেতেও পারি না… তবুও আল্লাহর ঘরের কাজ ছেড়ে যেতে পারি না।”

একটু থেমে আবার বলেন, “আমরা ইমাম-মোয়াজ্জেমরা কারো কাছে হাত পাততে লজ্জা পাই। কিন্তু কষ্ট তো থেমে থাকে না… আল্লাহ ছাড়া আমাদের দেখার কেউ নেই।” তার এই কথাগুলো যেন শুধু একজন ফারুকের নয়—এ যেন দেশের হাজারো ধর্মীয় সেবাদানকারীর নীরব আর্তনাদ।

হাফেজ মোঃ ফারুক গলাচিপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)-এর প্রতি এক বুক আশা নিয়ে আকুল আবেদন জানান—
“স্যার, আমাদের জন্য যদি সরকারিভাবে একটা ভাতা ব্যবস্থা করে দিতেন, তাহলে অন্তত পরিবারটা নিয়ে বেঁচে থাকার একটু সাহস পেতাম।

আমার মা, আমার সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে খুব কষ্ট হয়…” স্থানীয়দের অনেকেই জানান, সমাজে ধর্মীয় দায়িত্ব পালনকারীদের সম্মান থাকলেও তাদের জীবনের বাস্তবতা অনেক কঠিন। তাদের এই নীরব কষ্টের গল্প খুব কমই প্রকাশ পায়।

আজানের সুরে মানুষকে নামাজের ডাক দেন হাফেজ মোঃ ফারুক, কিন্তু তার নিজের জীবনের আর্তনাদ যেন সেই সুরেই হারিয়ে যায়। প্রশ্ন থেকে যায়—এই নীরব কান্না কি কখনো পৌঁছাবে দায়িত্বশীলদের হৃদয়ে? নাকি আজানের প্রতিটি ধ্বনির সঙ্গে মিশে থেকে যাবে এক অসহায় জীবনের অজানা ব্যথা…

দৈনিক বিজয় নিউজ/ নাসির উদ্দিন