২০১৮ সালে নির্বাচন হয়েছিল রাত ১০টা থেকে ভোর ৩টা পর্যন্ত
তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন
দৈনিক বিজয় নিউজ নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকাঃ
২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগের রাতেই সারা দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ ভোটকেন্দ্রে ব্যালট পেপারে সিল মেরে ব্যালট বাক্স ভরে রাখা হয়েছিল। এই প্রক্রিয়া রাত ১০টা থেকে শুরু হয়ে ভোর ৩টা পর্যন্ত চলে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আওয়ামী লীগকে জিতিয়ে দিতে এই 'রাতের ভোট' এর পরামর্শ দিয়েছিলেন তখনকার পুলিশ প্রধান (আইজিপি) জাবেদ পাটোয়ারী, যিনি পরবর্তীতে সৌদি আরবে রাষ্ট্রদূত নিযুক্ত হন। জুলাই মাসের গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি দেশে ফিরে আসেননি। আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত তিনটি বিতর্কিত নির্বাচন (২০১৪, ২০১৮, ২০২৪) তদন্তের জন্য গঠিত জাতীয় নির্বাচন তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচন দায়িত্বে থাকা প্রিসাইডিং ও সহকারী প্রিসাইডিং অফিসাররা কমিশনের কাছে রাতে সিল মারা ও ব্যালট বাক্স ভরার বিষয়টি স্বীকার করেছেন।
৩২৬ পৃষ্ঠার এই প্রতিবেদন গতকাল বুধবার প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং প্রকাশ করে। গত সোমবার কমিশনের সদস্যরা প্রতিবেদনটি প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জমা দেন। হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি শামীম হাসনাইনের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের এই কমিশন গত জুনে তিন নির্বাচনের অনিয়ম তদন্তে গঠিত হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) একটি 'স্পেশাল সেল' বা 'নির্বাচন সেল' গঠন করে, যা নির্বাচনের সব কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি করত। রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন, পর্যবেক্ষক নিয়োগ, নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বদলি, বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার ও হয়রানি এবং 'রাতের ভোট' বাস্তবায়নে এই সেল প্রধান ভূমিকা পালন করে।
কমিশনের প্রতিবেদনে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়ম, অসঙ্গতি, আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করানোর কৌশল, বিরোধী দলকে দমনের চেষ্টা এবং প্রশাসন, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকা বিশদভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। কমিশন দাবি করে, ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর থেকেই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে এই 'অভিনব' পরিকল্পনা শুরু হয় এবং তা বাস্তবায়নে সরকারি যন্ত্রণাকে ব্যবহার করা হয়। ২০১৮ সালের নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা ৩০ জন কর্মকর্তার মধ্যে ২৭ জন স্বীকার করেছেন যে তাদের কেন্দ্রে আগের রাতেই ব্যালটে সিল মেরে বাক্স ভর্তি করা হয়েছিল। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০১৮ সালের নির্বাচনে ২১৩টি কেন্দ্রে ১০০% ভোট পড়ার অস্বাভাবিক তথ্য পাওয়া গেছে। এমনকি ৭৫টি আসনের ৫৮৭টি কেন্দ্রে একজন প্রার্থী ১০০% বৈধ ভোট পেয়েছেন, যেখানে অন্য প্রার্থীরা একটিও ভোট পাননি।
তদন্ত কমিশন বলেছে, নির্বাচন কমিশন এই অনিয়মের খবর জানা সত্ত্বেও নিশ্চুপ থেকে আওয়ামী লীগকে সহযোগিতা করেছে। তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদাসহ নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা কমিশনের কাছে এই অনিয়ম স্বীকার করেছেন। ২০১৪ সালের নির্বাচনকে কমিশন 'বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন' আখ্যা দিয়েছে, যেখানে ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা নির্বাচিত হন। ২০২৪ সালের নির্বাচনকে 'ডামি নির্বাচন' বলা হয়েছে, যেখানে আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বিশেষ প্রতীক দিয়ে 'অংশগ্রহণমূলক' নির্বাচনের ছবি তৈরি করা হয়েছিল এবং ভুয়া পর্যবেক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে নির্বাচনকে 'গ্রহণযোগ্য' করার চেষ্টা করা হয়েছিল।
সর্বোপরি, কমিশন মন্তব্য করেছে যে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে প্রশাসন, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা এবং আওয়ামী লীগের কর্মীদের মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন ছিল।
দৈনিক বিজয় নিউজ/ ই