১৫ কোটি টাকার ইয়াবা চালান আর লবণের বস্তার আড়ালে কুমিল্লার মাদকের সাম্রাজ্য: বাহক জালে, গডফাদাররা ধরাছোঁয়ার বাইরে কেন?

১৫ কোটি টাকার ইয়াবা চালান আর লবণের বস্তার আড়ালে কুমিল্লার মাদকের সাম্রাজ্য: বাহক জালে, গডফাদাররা ধরাছোঁয়ার বাইরে কেন?
ছবিঃ সুমন আহমেদ

দৈনিক বিজয় নিউজ বিশেষ প্রতিনিধি:

কুমিল্লার সড়ক-মহাসড়ক ও জনপদগুলোতে এখন মাদকের ভয়ংকর থাবা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারি এড়াতে লবণের বস্তা, অ্যাম্বুলেন্স কিংবা বিলাসবহুল প্রাডো গাড়ির আড়ালে আসছে কোটি কোটি টাকার মাদকের চালান। মাঝে মাঝে ১৫ কোটি টাকার ইয়াবা বা বিপুল পরিমাণ গাঁজা আটকের বড় বড় খবর সংবাদ শিরোনাম হলেও জনমনে ঘুরপাক খাচ্ছে এক গভীর প্রশ্ন—চালান ও বাহক ধরা পড়লেও এই বিশাল সাম্রাজ্যের মূল হোতারা সব সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায় কেন? ​প্রকাশ্যেই চলছে মাদক বাণিজ্য, প্রশ্ন উঠছে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে ​কুমিল্লার বুড়িচং, ব্রাহ্মণপাড়া ও ময়নামতি এলাকা থেকে শুরু করে জেলার প্রতিটি থানার অলিতে-গলিতে আজ মাদকের রমরমা আসর। স্থানীয়দের ক্ষোভ, পাড়া-মহল্লায় প্রকাশ্যেই মাদক বিক্রি হলেও মাঝেমধ্যে কেবল দু-চারজন চুনোপুঁটি সেবনকারী বা গরিব গাড়িচালককে আটক করে দায় সারা হয়। অথচ ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায় মূল পাইকারি ডিলার ও গডফাদাররা। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—পুলিশ কি তবে সব দেখেও না দেখার ভান করছে? কুমিল্লা কি তবে সত্যিই মাদকের রাজধানীতে পরিণত হয়েছে?

​১৫ কোটি টাকার চালানের পেছনে কার হাত? ​গত কয়েক মাসে কুমিল্লায় একের পর এক ধরা পড়েছে রেকর্ড পরিমাণ মাদক।​আগস্ট মাসে একটি প্রাডো গাড়ি থেকে ৩ লাখ ইয়াবা উদ্ধার করা হয়, যার বাজারমূল্য প্রায় ১৫ কোটি টাকা। ​এর আগে জুন মাসে পদুয়ার বাজারে লবণবাহী কাভার্ডভ্যান থেকে জব্দ করা হয় ১ লাখ ৬০ হাজার ইয়াবা। এসব ঘটনায় গাড়িচালক ও সহকারীদের আটক করা হলেও, গোয়েন্দারা বলছেন—একটি ১৫ কোটি টাকার চালান কোনো সাধারণ বাহকের পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব। এর পেছনে রয়েছে বিশাল আর্থিক বিনিয়োগ, শক্তিশালী সিন্ডিকেট এবং প্রভাবশালীদের নেটওয়ার্ক। অথচ ফাইন্যান্সিয়াল ইনভেস্টিগেশন বা অর্থের উৎস খোঁজার মাধ্যমে মূল হোতাদের মুখোশ উন্মোচনের দৃশ্যমান অগ্রগতি খুব একটা দেখা যায় না।

​জব্দ মাদকের পরিমাণ নিয়ে চাঞ্চল্যকর প্রশ্ন মাদক উদ্ধারের সফলতার খবরের আড়ালে মাঝেমধ্যে উঠে আসছে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ। জব্দকৃত মাদকের সঠিক পরিমাণ নিয়ে গরমিল, মামলার এজাহারে মাদকের ওজন কমিয়ে দেখানো এবং মালখানায় সংরক্ষিত মাদকের নিরাপত্তা নিয়ে জনমনে তীব্র অসন্তোষ রয়েছে। হিসাবের খাতায় গরমিল বা একটি কেজিও যদি আত্মসাতের ঘটনা ঘটে, তবে তা পুরো মাদকবিরোধী অভিযানের বিশ্বাসযোগ্যতাকে মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ​শেষ কথা: লোক দেখানো অভিযান নয়, চাই মূল উৎপাটন ​মাদকবিরোধী লড়াইয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঝুঁকি ও অভিযানকে অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু শুধু বাহক বা গাড়ির চালককে আটকে রাখলেই মাদক নির্মূল সম্ভব নয়। বিভিন্ন রুট হয়ে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করা মাদক চালানের সরবরাহকারী থেকে শুরু করে দেশের ভেতরের গডফাদার, অর্থদাতা এবং আশ্রয়দাতাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। ​প্রশাসনকে দলীয় প্রভাব ও দুর্নীতির ঊর্ধ্বে উঠে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে। অন্যথায়, কুমিল্লার তরুণ সমাজকে রক্ষার এই আকুতি কেবল লোকদেখানো খবরের পাতাতেই সীমাবদ্ধ হয়ে থাকবে।

দৈনিক বিজয় নিউজ/ ​সুমন আহমেদ