কুমিল্লা দেবিদ্বারের মেয়ে ​গ্যাসলাইনের লিকেজ কেড়ে নিল একই পরিবারের তিন প্রাণ: ঢাকায় নিভে গেল ফাহিমা, শাহিন ও শিশু হাফসার রঙিন সব স্বপ্ন

কুমিল্লা দেবিদ্বারের মেয়ে ​গ্যাসলাইনের লিকেজ কেড়ে নিল একই পরিবারের তিন প্রাণ: ঢাকায় নিভে গেল ফাহিমা, শাহিন ও শিশু হাফসার রঙিন সব স্বপ্ন
ছবিঃ সুমন আহমেদ

দৈনিক বিজয় নিউজ বিশেষ প্রতিনিধিঃ

​সংসার পাতার হাজারো রঙিন স্বপ্ন বুকে নিয়ে স্বামী আর ছোট্ট ভাগনিকে সঙ্গে করে রাজধানীতে পাড়ি জমিয়েছিলেন ফাহিমা আক্তার। নিজের মেধা ও পরিশ্রমে তিল তিল করে গড়ে তুলবেন ভালোবাসার একটি সুন্দর নীড়—এমনটাই ছিল তার পরিকল্পনা। কিন্তু কে জানত, নিয়তির পাতায় লেখা ছিল অন্য এক মর্মান্তিক করুণ ইতিহাস! সামান্য একটি অবহেলা আর গ্যাসলাইনের বিষাক্ত লিকেজ মুহূর্তের মধ্যেই পুড়িয়ে ছাই করে দিল তাদের সাজানো গোছানো সব স্বপ্ন। ​হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে শনিবার (২৫ জুলাই) সন্ধ্যায় না ফেরার দেশে চলে গেলেন কুমিল্লার দেবিদ্বারের কৃতি সন্তান ফাহিমা। আর এই একই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় বৃহস্পতিবার রাতে পাড়ি জমান স্বামী আনোয়ার হোসেন শাহিন এবং শুক্রবার আকস্মিক বিদায় নেয় আদরের ভাগনি হাফসা। মুহূর্তের ব্যবধানে একটি পুরো পরিবার চিরতরে নিভে গেল। ​নিহত ফাহিমা আক্তার দেবিদ্বার উপজেলার গোমতী আবাসিক এলাকার গোলাম হোসেনের ছোট মেয়ে। পড়াশোনার পাশাপাশি কেক তৈরি ও পোশাক বিক্রিসহ নানা পণ্যের অনলাইন উদ্যোক্তা হিসেবে নিজের পায়ে শক্তভাবে দাঁড়াতে চেয়েছিল সে। সেই লক্ষ্যেই স্বামীর হাত ধরে পা রেখেছিল রাজধানীর উত্তর বাড্ডার এক ভাড়া বাসায়। সঙ্গে পড়ালেখার জন্য নিয়ে এসেছিল বড় বোনের আট বছরের শিশুকন্যা হাফসাকে।

​পরিবার সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর দেবিদ্বারের ৯নং গুনাইঘর উত্তর ইউনিয়নের বাঙ্গুরী গ্রামের মীর্জা আলী ব্যাপারী বাড়ির শাহিনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন ফাহিমা। বিয়ের পর মাত্র দেড় মাস আগে তারা রাজধানীর উত্তর বাড্ডা এলাকার একটি ভবনের নিচতলায় বাসা ভাড়া নেন। কিন্তু গত ২১ জুলাই রাত ৩টার দিকে হঠাৎ করেই বাসাসংলগ্ন গ্যাসলাইনের লিকেজ থেকে বিকট শব্দে ঘটে এক ভয়াবহ বিস্ফোরণ। মুহূর্তের মধ্যে আগুনের লেলিহান শিখা গ্রাস করে নেয় দুটি কক্ষ। ​ভয়াবহ এই আগুনে আশঙ্কাজনকভাবে দগ্ধ হন ফাহিমা, তার স্বামী শাহিন ও শিশু হাফসা। প্রতিবেশীরা দ্রুত তাদের উদ্ধার করে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করেন। সেখানে শরীরের প্রায় ৭০ শতাংশ দগ্ধ নিয়ে মৃত্যুর সঙ্গে কয়েক দিন লড়াই করে শনিবার সন্ধ্যায় ফাহিমাও হার মানেন নিয়তির কাছে। এর আগেই একে একে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছিলেন তার স্বামী শাহিন ও ভাগনি হাফসা। ​প্রিয়জনদের এমন আকস্মিক ও করুণ মৃত্যুতে পুরো এলাকায় নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। পরিবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, শুক্রবার বাদ মাগরিব শিশু হাফসাকে তার বাবার বাড়ি দেবিদ্বারের সুলতানপুর গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। অপরদিকে শাহিনকে দাফন করা হয় বাঙ্গুরী গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে। ​রোববার সকাল সাড়ে ৯টায় দেবিদ্বার পৌর সদরের গোমতী আবাসিক এলাকার চানমিয়া মার্কেট মাঠে ফাহিমার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে সকাল সাড়ে ১০টায় বাঙ্গুরী গ্রামে স্বামীর পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় ফাহিমাকে। একসঙ্গে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখা এই দম্পতি এখন চিরতরে এক হলো মাটির কবরে।

দৈনিক বিজয় নিউজ/ সুমন আহমেদ