রাজশাহী মোহনপুর উপজেলার আমরাইলে ১৪ শিক্ষক, এসএসসিতে ১৩ জনই ফেল শূন্য পাসের নেপথ্যে কী? পাঠদানে গাফিলতি

রাজশাহী মোহনপুর উপজেলার আমরাইলে ১৪ শিক্ষক, এসএসসিতে ১৩ জনই ফেল শূন্য পাসের নেপথ্যে কী? পাঠদানে গাফিলতি
ছবিঃ মোঃ রাজিব খাঁন

দৈনিক বিজয় নিউজ বিশেষ প্রতিনিধিঃ

শিক্ষার্থীদের অমনোযোগিতা নাকি শিক্ষা অফিসের নজরদারির ব্যর্থতা রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার আমরাইল উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকসহ কর্মরত ১৪ জন শিক্ষক। অথচ চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় এ বিদ্যালয় থেকে অংশ নেওয়া ১৩ পরীক্ষার্থীর একজনও উত্তীর্ণ হতে পারেনি। শতভাগ অকৃতকার্যের মধ্য দিয়ে বিদ্যালয়টির পাসের হার নেমে এসেছে শূন্য শতাংশে।
একটি বিদ্যালয়ে পর্যাপ্তসংখ্যক শিক্ষক থাকার পরও একজন পরীক্ষার্থীও পাস না করায় এখন প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি কেবল শিক্ষার্থীদের অমনোযোগিতা ও পড়াশোনায় দুর্বলতার ফল, নাকি এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের পাঠদান ঘাটতি, শিক্ষকদের দায়িত্ব পালনে অবহেলা, বিদ্যালয় পরিচালনায় দুর্বলতা এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষা অফিসের কার্যকর মনিটরিংয়ের অভাব? সোমবার (১০ আগস্ট) এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর মোহনপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে বিদ্যালয়টির ফলাফলের এ তথ্য পাওয়া যায়।

১৪ শিক্ষক, তবু একজনও পাস নয়—দায় কার? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক থাকেন শিক্ষার্থীদের পাঠদান, দুর্বলতা চিহ্নিতকরণ, পরীক্ষার প্রস্তুতি এবং ফলাফল উন্নয়নের জন্য। কিন্তু আমরাইল উচ্চ বিদ্যালয়ে ১৪ জন শিক্ষক কর্মরত থাকার পরও এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১৩ জনের সবাই অকৃতকার্য হয়েছে। এ অবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—পরীক্ষার্থীদের দুর্বলতা কি বছরজুড়ে শিক্ষকরা শনাক্ত করতে পারেননি? বিদ্যালয়ে নিয়মিত ক্লাস হয়েছে কি না, তা যাচাই করা হয়েছিল? শ্রেণি পরীক্ষার ফলাফল দেখে দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য কোনো বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের মতে, একজন-দুজন শিক্ষার্থী ফেল করলে ব্যক্তিগত প্রস্তুতির ঘাটতির বিষয়টি সামনে আসতে পারে। কিন্তু একটি প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষার্থীদের শতভাগ অকৃতকার্য হলে সেখানে প্রতিষ্ঠানটির সামগ্রিক একাডেমিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

শিক্ষকদের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক নিয়মিত ও কার্যকরভাবে পাঠদানে মনোযোগী ছিলেন না। শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত সময় দিতেন কি না, শিক্ষার্থীদের পড়া আদায় করতেন কি না এবং পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের আলাদাভাবে সহায়তা করতেন কি না—এসব নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগ সত্য হলে বিষয়টি শুধু শিক্ষার্থীদের ফলাফলের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; বরং সরকারি বেতন-ভাতা গ্রহণকারী শিক্ষকদের দায়িত্ব পালনের বিষয়টিও সামনে আসে। ফলে শিক্ষকদের উপস্থিতি রেজিস্টার, ক্লাস রুটিন, পাঠদানের রেকর্ড এবং বিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রমের নথি যাচাই করা জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

প্রধান শিক্ষকের উপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মঞ্জুর রহমান মঞ্জুর নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকা নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোগ রয়েছে। কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধেও পাঠদানে অনাগ্রহের অভিযোগ করা হয়েছে। এছাড়া স্থানীয় কয়েকজন প্রধান শিক্ষক ও একজন সহকারী শিক্ষকের বিরুদ্ধে মাদক সেবনের অভিযোগ তুলেছেন। তবে এ অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এ ধরনের গুরুতর অভিযোগ সত্য বা মিথ্যা—তা নির্ধারণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। অভিযোগ জানা থাকলে তা তদন্ত করা হয়েছিল কি না, তদন্ত হয়ে থাকলে তার ফল কী এবং কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না—এসব তথ্যও জনসমক্ষে আসা প্রয়োজন।

একাডেমিক সুপারভাইজারের বক্তব্যেই নতুন প্রশ্ন আমরাইল উচ্চ বিদ্যালয় নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি হয়েছে মোহনপুর উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার আব্দুল মতিনের বক্তব্যের পর। তিনি বলেন, “প্রধান শিক্ষক ও একজন সহকারী শিক্ষক নিয়মিত মাদক সেবন করেন—এমন বিষয় জানার পরও তারা বিগত সরকারের লোক হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। এখন থেকে প্রতিটি বিদ্যালয়ে নিয়মিত মনিটরিং করা হবে।” এই বক্তব্যের পরই প্রশ্ন উঠছে—যদি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ আগে থেকেই জানা থাকে, তাহলে এতদিন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন? আর যদি কোনো শিক্ষক দায়িত্ব পালনে অনিয়ম করেন, তাহলে রাজনৈতিক পরিচয় বা অতীতের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার সঙ্গে সেই অভিযোগের প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সম্পর্ক কী?

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—মনিটরিং যদি এতদিন হয়ে থাকে, তাহলে বিদ্যালয়টির একাডেমিক বিপর্যয় আগে শনাক্ত হলো না কেন? মনিটরিং ছিল, নাকি শুধু কাগজে? বিদ্যালয় পরিদর্শন, শিক্ষকদের উপস্থিতি, শ্রেণিকক্ষে পাঠদান, শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি এবং অভ্যন্তরীণ পরীক্ষার ফলাফল পর্যবেক্ষণ—এসবই একাডেমিক মনিটরিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাহলে আমরাইল উচ্চ বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে গত এক বছরে শিক্ষা অফিসের পক্ষ থেকে কতবার একাডেমিক পরিদর্শন হয়েছে? পরিদর্শনের সময় কোনো সমস্যা চিহ্নিত হয়েছিল কি না? কোনো লিখিত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল কি না? দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত ক্লাস নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল কি না?

এসব প্রশ্নের উত্তর এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ একটি বিদ্যালয়ের ১৩ জন পরীক্ষার্থীর সবাই ফেল করার পর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা যতটা সহজ, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো—ফলাফল বিপর্যয়ের আগেই সমস্যাটি কেন শনাক্ত করা গেল না। শিক্ষার্থীদের অমনোযোগিতাও তদন্তের আওতায় আসুক বিদ্যালয়ের ফলাফল বিপর্যয়ের দায় শুধু শিক্ষকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়াও যুক্তিসঙ্গত নয়। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি, পড়াশোনায় মনোযোগ, বাড়ির কাজ, পরীক্ষার প্রস্তুতি এবং অভিভাবকদের নজরদারিও তদন্তের অংশ হওয়া প্রয়োজন। কোনো শিক্ষার্থী যদি দীর্ঘদিন ক্লাসে অনুপস্থিত থাকে, নিয়মিত পরীক্ষায় খারাপ করে অথবা পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ে—তাহলে শিক্ষক ও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সেই তথ্য জানতেন কি না, সেটিও দেখতে হবে। একই সঙ্গে অভিভাবকদের সঙ্গে শিক্ষকরা নিয়মিত যোগাযোগ করেছেন কি না, শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা সম্পর্কে অভিভাবকদের জানানো হয়েছিল কি না—এসব বিষয়ও খত

দৈনিক বিজয় নিউজ / মোঃ রাজিব খাঁন